প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরপরই সরে দাঁড়ালেন এ সংসদ সদস্য।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও দখলের চেষ্টার ঘটনায় আলোচিত বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার তিনি পদত্যাগ করায় আসনটি শূন্য হয়েছে বলে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ৩২৩ আসন (নারী আসন-২৩) সংবিধানের ৬৭ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শূন্য হয়েছে।
সংবিধানের এ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে, যদি—
“(২) কোন সংসদ-সদস্য স্পীকারের নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন, এবং স্পীকার- কিংবা স্পীকারের পদ শূন্য থাকিলে বা অন্য কোন কারণে স্পীকার স্বীয় দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হইলে ডেপুটি স্পীকার- যখন উক্ত পত্র প্রাপ্ত হন, তখন হইতে উক্ত সদস্যের আসন শূন্য হইবে।”
সংসদ সচিব গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়ার সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মিষ্টির শূন্য হওয়া আসনটি পূরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়কে অনুরোধ করেছে সংসদ সচিবালয়।
একই সঙ্গে বিজ্ঞপ্তিটি বৃহস্পতিবারই বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশের জন্য ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এদিন দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে সংসদ ভবনে স্পিকারের দপ্তরে যান মিষ্টি। পাঁচ মিনিট পর ১টা ৪৫ মিনিটে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
বের হওয়ার সময় অপেক্ষমাণ সাংবাদিকরা তার কাছে পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চান। মিষ্টি বলেন, “স্পিকার ডেকেছেন। স্পিকারের সাথে কথা বলতে আসছি।”
রাড্ডাকাণ্ডে প্রধানমন্ত্রীর তাকে পদত্যাগপত্র করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন?
জবাবে মিষ্টি বলেন, “তদন্ত হোক। তদন্ততে যা হবে সেটাই হবে। আমাকে স্পিকার ডেকেছেন, আমি স্পিকারের সাথে কথা বলতে আসছি।”
পরে আবার পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিএনপির ডিসিশন যেটা হবে, সেটা হবে।”
এরপর আর কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সংসদ ভবন থেকে বেরিয়ে যান মিষ্টি।
ধ্বংসের ক্ষত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ঢাকার মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার।
এর আগে ঢাকার মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারপ্রধানের প্রেস সচিব আবু আব্দুল্লাহ এম ছালেহ বৃহস্পতিবার দুপুরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তবে সংসদ সচিবালয়ের স্পিকারের দপ্তর থেকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলা হয়েছিল, মিষ্টির কোনো পদত্যাগপত্র তাদের কাছে আসেনি।
১৯৭৪ সাল থেকে মিরপুরের গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে রাড্ডার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
প্রায় দুইশ লোক দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সেখানে ঢুকে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেয়। আর পাকা ভবনের আল্ট্রাসাউন্ড কক্ষ, টিকা কক্ষ, ল্যাবরেটরিসহ পাঁচটি কক্ষের জানালা-দরজা ভেঙে ফেলা হয়।
ভবনটি থেকে সব ধরনের আসবাবপত্র, ওষুধসামগ্রী, আল্ট্রাসোনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি, আলমারি নিয়ে যায় হামলাকারীরা। সব মিলিয়ে পুরো স্থাপনাটির কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয় বলে রাড্ডা কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাটের পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’ এর সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে যায়।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় করা মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
হানিফ মিয়া ছাড়াও ওই ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতার নাম আসে, যারা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য আসে।
২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন মিষ্টি। রাড্ডা সেন্টারের জমিটি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য তখন গৃহায়ন ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। তাতে সভাপতি হিসেবে মিষ্টির সই ছিল।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি প্রয়াত বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর ছোট বোন। তার স্বামী প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকার একটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর মিষ্টি ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
রাড্ডাকাণ্ড নিয়ে আলোচনার মধ্যেই বুধবার রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই দিনে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। এছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জনকে বহিষ্কারের ঘোষণা আসে।