চলতি অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরেছে সরকার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
মুদ্রানীতি ঘোষণার করে অর্থনীতিতে একাধিক ঝুঁকির কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে পূর্বাভাস দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, সরকারি চাকুরেদের বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক সংবাদ সম্মেলনে অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান মুদ্রানীতির বিভিন্ন দিক ও লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন।
বরাবরই মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে গভর্নর সংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিলেও গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার মেয়াদকালের এটি দ্বিতীয় মুদ্রানীতি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নীতিসুদহার আগের মতই অর্থাৎ সাড়ে ৯ শতাংশ ঠিক রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতি সুদহারে কোনো বদল না করার কারণ হিসেবে দেখানো হয়, অভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক চাপকে।
এছাড়া স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফেসিলিটি (এসএলএফ) বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকগুলোর নেওয়া ঋণের সুদহার ১১ শতাংশ বহাল রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফেসিলিটি (এসডিএফ) হার আগের মতো সাড়ে ৭ শতাংশ রাখা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমার গতি ‘অনেকটা অনিশ্চিত’
কঠোর মুদ্রানীতি চলমান রাখায় মূল্যস্ফীতির হার অগাস্টে কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা ১০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম।
মূল্যস্ফীতির পারদ কমে যাওয়ার বার্তার মধ্যেই চলতি মাস সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি ২০ টাকা বাড়ায়।
বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার সেই ধারা বজায় থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতিতে যে ঝুঁকি উঁকি দিচ্ছে তা তুলে ধরে মুদ্রানীতির লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, “সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি গত অগাস্টে দশ মাসের সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা মূলত ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশে নেমে আসা খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রতিফলন।
“তবে, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে, যা ক্রমাগত অন্তর্নিহিত মূল্যস্ফীতির চাপ নির্দেশ করে।”
গত অগাস্টে খাদ্যবহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়। এটি সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি। সেই তথ্য তুলে ধরে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, “নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি মূল্যের সাম্প্রতিক বৃদ্ধি পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে পারে। এছাড়া, জাতীয় বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মূল্যস্ফীতির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত অগাস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ; জুলাইয়ে যা হয়েছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
অপরদিকে অগাস্টে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ; জুনে যা ছিল ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ।
মুদ্রানীতির সার-সংক্ষেপে বলা হয়, “সাম্প্রতিককালে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হ্রাস টেকসই মূল্যহ্রাসের পর্যাপ্ত প্রমাণ দেয় না। কেননা মূল্যস্ফীতি এখনও সরবরাহ ও ব্যয়ের চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
“বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, নিয়ন্ত্রিত জ্বালানি মূল্যের সাম্প্রতিক উর্ধ্বমুখী সমন্বয় এবং জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব এর অন্যতম কারণ। যথাযথ সময়ের আগে মুদ্রানীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বাড়তে পারে এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রায় ফিরে আসা বিলম্বিত হতে পারে।”
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমতে পারে বলে পর্যবেক্ষণ দিলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সেই কমে আসার গতি অনেকটা অনিশ্চিত।
এ ক্ষেত্রে পশ্চিম এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধাকেও একটি কারণ বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ হল, এটি অর্থনীতিতে এক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।
এর বাইরে অর্থনীতিতে আরও কয়েকটি প্রধান ঝুঁকি দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেগুলো হল-বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, কঠোর বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ, জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা।
এসব ঝুঁকির মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী মুদ্রানীতি কতটা সফল হচ্ছে? জবাবে ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, “যে মাত্রায় কাজ করার কথা হয়ত সেভাবে করছে না। একেবারেই যে করছে না, তা না।”
প্রত্যাশিত জিডিপি অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জিডিপির তথ্য এখনো প্রস্তুত হয়নি। তবে সরকার প্রকৃত জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ আশা করছে।
শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হওয়ার তথ্য দিয়ে প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।