বাংলাদেশের জন্য স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অপরিহার্যতা কেন অতি গুরুত্বপূর্ণ—তা দেশের মানচিত্রের দিকে তাকালেই সহজে অনুধাবন করা যায়।
বাংলাদেশের তিন দিকে ভারত, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মিয়ানমার। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে তিনটি বড় চাপ—দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি, ইন্দো-প্যাসিফিকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পশ্চিমা বাজারের বাণিজ্যিক প্রভাব। এমন অবস্থানে কোনো বৃহৎ শক্তির 'প্রক্সি' বা ছায়া যুদ্ধের মাঠে পরিণত হওয়াই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তাই জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্যিক সহনশীলতা ও সার্বভৌম মর্যাদার ভিত্তিতে ভারসাম্য রক্ষা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২০৯টিতে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। নতুন সরকার যে পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতা পেয়েছে, তা জটিল।
২০২৪ সালের আগস্টে পট পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা, ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি এবং সীমান্তের ওপারে এমন এক রাখাইন রাজ্য, যা আর পুরোপুরি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেই—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন।
সরকার এর জবাবে 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির কথা বলছে। নির্বাচনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে এবং 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতিকে দিকনির্দেশক হিসেবে নেবে।
দলের ইশতেহার অনুযায়ী, পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য মাপা হবে সাধারণ মানুষের জন্য তার সুফল দিয়ে, মতাদর্শিক জোটবদ্ধতা দিয়ে নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চলবে সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিকতার ভিত্তিতে। কোনো একক শক্তির ওপর ভবিষ্যৎ বাজি না রেখে প্রতিটি বড় অংশীদারের কাছ থেকে তুলনীয় সুবিধা আদায়ের কথাও বলা হয়েছে।
স্লোগান হিসেবে এটি আকর্ষণীয়। তবে এর মধ্যে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত প্রায়ই আবেগী প্রতীকে পরিণত হয়।অথচ নদী, সীমান্ত-অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিবেশের কারণে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা।
একজন বিশ্লেষক এটাকে এভাবে দেখেছেন—দলীয় রাজনীতির গল্পে ভারত সম্পর্ক না হয়ে প্রতীকে পরিণত হয়, চীন কৌশল না হয়ে চেকবই হয়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র বক্তার অবস্থান অনুযায়ী কখনো ত্রাতা, কখনো ষড়যন্ত্রকারী।
সম্পর্ক এখন পুনর্বিন্যাসের পর্যায়ে। ভারত বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, ভিসা সেবা চালু করেছে এবং এপ্রিলে নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে আতিথ্য দিয়েছে।
তবে ঢাকা শর্তহীন উষ্ণতার পথে যায়নি। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া, স্থবির তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি, সংযোগ ও জ্বালানি সরবরাহে পারস্পরিকতাকে সম্পর্কের পরবর্তী ধাপের শর্ত হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে জরুরি ইস্যু পানি। দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদীর মধ্যে কেবল গঙ্গা নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি আছে, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১২ ডিসেম্বর। চুক্তির বণ্টনসূচি পুরোনো প্রবাহ-উপাত্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বর্তমান অববাহিকার বাস্তবতা বিবেচনায় অনেক ধরনেরই পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দ্রুত এগিয়েছে। জুন ২০২৬-এ প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে ১৫টি সমঝোতা স্মারক, প্রায় ৩০ কোটি ডলারের অনুদান এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পর্যায়ে ২+২ সংলাপ চালুর সিদ্ধান্ত হয়।
বেইজিং মোংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন অধিকার পেয়েছে, যা আগে একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তিস্তা প্রকল্পেও নতুন গতি এসেছে।
চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ও প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী।
অবকাঠামো ও পুঁজির ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্ব অস্বীকার করা কঠিন। তবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে একক উৎস নির্ভরতা এবং স্পর্শকাতর বন্দর প্রকল্পে একপক্ষীয় উপস্থিতি অন্য শক্তিগুলোর কাছে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তাই প্রকল্পের শর্তেস্বচ্ছতা, ঋণের টেকসইতা যাচাই এবং প্রতিরক্ষা সংগ্রহে বৈচিত্র্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জটিল, কারণ এখানে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পাশাপাশি এসেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করে। এতে অধিকাংশ বাংলাদেশি পণ্যে ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হয় এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সরকারি ক্রয় ও 'জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা' বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
নতুন সরকারের শপথের পর হোয়াইট হাউসের একটি চিঠিতে ঝুলে থাকা প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলোতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ঢাকাকে তাগিদ দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক বাস্তবতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকরপ্তানি ২.৬৩ শতাংশ বেড়ে ৭৭৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ। মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় শুল্ক কাঠামোর আইনি ভিত্তি দুর্বল করায় চুক্তি পুনরালোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি বিশেষ দিক হলো, ভূরাজনৈতিক বিতর্কে ইউরোপ আড়ালে থাকলেও অর্থনৈতিকভাবে এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণঅংশীদারদের একটি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইইউতে পোশাক রপ্তানি ৩.৩১ শতাংশ কমে ১,৯০৬ কোটি ডলার হয়েছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে ইইউর অংশ ৫০.১০ থেকে নেমে ৪৯.২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এরপর অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা ধীরে ধীরে কমবে। জিএসপি প্লাসের শর্তপূরণে শ্রম অধিকার, মানবাধিকারও সুশাসনের সংস্কার তাই বাণিজ্যিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, মিয়ানমার সীমান্তে বাংলাদেশের জন্য রয়েছে প্রক্সি যুদ্ধক্ষেত্রের ঝুঁকি। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্তে সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু প্রত্যাবাসনের টেকসই সমাধান নেই। আরাকান আর্মি বাংলাদেশ-সংলগ্ন রাখাইনের বড় অংশ কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে। মানবিক করিডর বা সামরিক সহায়তার যেকোনো প্রস্তাব এখানে অন্য শক্তির কাছে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হতে পারে। সরকার আরাকান আর্মি ও তার রাজনৈতিক শাখার সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছে, একইসঙ্গে নেপিদোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলও বজায় রেখেছে।
এখন বাংলাদেশকে বুঝতে হবে—কৌশলগত নিরপেক্ষতা কী? কৌশলগত নিরপেক্ষতা নিষ্ক্রিয়তা নয়, বা সবার থেকে সমান দূরত্ব নয়। এর অর্থ কোনো সামরিক জোট বা একপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে না জড়ানো, নিজের ভূখণ্ড ও বন্দরকে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ হতে না দেওয়া, অর্থনৈতিক সম্পর্কে সক্রিয়তা ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিটি সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থকে মাপকাঠি করা।
এলডিসি-উত্তর রূপান্তরে বাংলাদেশকে বৈদেশিক পুঁজি, বিশ্ব বাজার, ভারতীয় সংযোগ ও পানি বণ্টন এবং উপসাগরীয় রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করতেই হবে। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং প্রতিরক্ষায় চীনের দিকে ঝোঁকার অভিযোগ রয়েছে। নিরপেক্ষতা কখনো সহজভাবে অর্জন করা যায় না, এটি ধারাবাহিকভাবে অর্জন করতে হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক প্রশ্ন 'কার পক্ষে যাব' নয়। প্রশ্ন হলো, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়' নীতিকে আজকের বহুমেরু বিশ্বে তথ্যনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলে রূপ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ, এলডিসি উত্তরণ এবং রাখাইনের অস্থিরতা ২০২৬ সালের শেষপ্রান্তে তিনটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পরীক্ষা দূরদর্শিতার সঙ্গে মোকাবিলা করাই বাংলাদেশের নীতি নির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.