দেশপ্রেম, প্রজ্ঞা ও অধ্যয়নপ্রীতির অনন্য সংমিশ্রণে গড়া সাংবাদিকতার প্রতীক—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অকালপ্রয়াণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর স্মৃতিচারণ।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী—আধুনিক বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম এই পথিকৃতের সহজভাবে বা সোজাকথায় মূল্যায়নের সুযোগ নেই। তার জীবনের আয়ু ছিল কম, মৃত্যুর খবরও তাই আমাদের কাছে আকস্মিক।
গত শুক্রবার যখন খবরটি পেলাম—‘তৌফিক ইমরোজ খালিদী নেই’, আমার প্রথমেই মনে হলো, আমরা একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক, শিক্ষিত ও প্রজ্ঞাবান সাংবাদিককে হারিয়ে ফেললাম। আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল দারুণ।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে মূল্যায়ন করতে হলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ডিজিটাল সাংবাদিকতার কথাটিই আসবে প্রথমে। এমন একটি প্রতিষ্ঠান তিনি বাংলাদেশে গড়ে তুলেছেন, যার শুরু থেকে নানা প্রতিকূলতা তাকে পার করতে হয়েছে। সমস্ত বাধার পরও সংবাদের সঠিক তথ্য ও উপস্থাপন বিডিনিউজকে আলাদা করেছে।
বিডিনিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সুমন মাহমুদের সৌজন্যে সাক্ষাৎ হয়েছিল তৌফিক ইমরোজের সঙ্গে। আপাদমস্তক শিক্ষিত, স্মার্ট এই সাংবাদিক নিজের সমস্ত প্রজ্ঞা আর নেতৃত্বগুণে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি আমার অনুরাগের মূল কারণ মুক্তিযুদ্ধ। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, আমৃত্যু সেই পথেই তিনি নিজেকে পরিচালিত করেছেন। বহুবারই দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধারা বিপদে পড়েছেন, কিন্তু খালিদী মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভুলতে’ দেননি।
আমি নিজেও পড়েছি তার বক্তব্যে—মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভুলিয়ে’ দেওয়ার যে চেষ্টা, সেটা তিনি রুখতে চেয়েছেন। মুক্তির ইতিহাসকে তিনি কফির টেবিলের নিয়মিত চর্চার বিষয় হিসেবে উপস্থাপনের স্বপ্নেই ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর মতো বই প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। বিপুল প্রতিকূল সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে আগলে রেখে তিনি যে নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে তা পরবর্তী প্রজন্মকেও পথ দেখাবে।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রশ্নে আমার ব্যক্তিগত ভালোলাগার বিষয় হচ্ছে তার অধ্যয়নপ্রীতি। তার অধ্যয়ন তার পেশাগত উৎকর্ষকে ছুঁয়ে গেছে। আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও রাজনীতিকদের সঙ্গে তার নিরপেক্ষ সাংবাদিকসুলভ অবস্থান ও সম্পর্ক আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে।
একজন মানুষ হিসেবে সমালোচনার নানা ধরন থাকলেও পেশাগত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমাদের দেশের শীর্ষ সাংবাদিকদের একজন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মদক্ষতায় তার মতো সাংবাদিক আমাদের দেশে বিরল।
আমি দেখেছি, আমাদের নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানও গুণী সাংবাদিকদের নানা রকম দায়িত্বে টেনে নিয়ে এসেছেন। এবিএম মূসাকে তিনি প্রেস ট্রাস্টের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যদিও তিনি আগে থেকেই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। আমার অভিজ্ঞতায় মরহুম আতাউস সামাদ, নূরুল কবীর, মতিউর রহমান, মতিউর রহমান চৌধুরীসহ আরও অনেকের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সাংবাদিকতার যে প্রকাশ দেখেছি, সেখানে তৌফিক ইমরোজ খালিদীও নিজেকে সেই কাতারে নিয়ে গেছেন প্রজ্ঞার সঙ্গে।
আজকালকার দিনে আমি সাংবাদিকদের মধ্যে এর বিপুল অনুপস্থিতি দেখে দুঃখ পাই। আমাদের প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধ, জাতির সংগ্রামের কথা যেভাবে ‘ভুলে’ যাচ্ছে বা ‘ভুলিয়ে’ দেওয়া হচ্ছে, সেদিক থেকে তৌফিক ইমরোজ খালিদী একটি মাইলফলক।
মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার যে অপার আগ্রহ আর গুরুত্বারোপ ছিল, তা নতুন প্রজন্মের কাছে স্বপ্নের মতো। সবাই মিলে যে একটি রাষ্ট্রকে স্বাধীন করেছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, সেই রাষ্ট্রের ইতিহাস নিরূপণে তৌফিক ছিলেন পক্ষপাতহীন। এই গুণ তার প্রতি সমাজের নানা স্তরের মানুষকে টেনে নিয়েছে।
তার নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর গণতন্ত্র ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার পাশে থেকেছে বিগত বিশ বছর। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসন ও গণতন্ত্রহীনতার সময়টিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক দলগুলোকে তার গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ধারাবাহিকভাবে।
অভিযোগ বা অনুযোগ বা সমালোচনা—আজকের এপিটাফে আমি এসব স্বাভাবিক মানবিক বিষয় উত্থাপন করতে অপারগ। আমরা কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নই, তবে সমালোচনার ঊর্ধ্বে তিনি একজন প্রকৃত সাংবাদিক।
এটা বলতে হয়, তৌফিক ইমরোজের মতো সাংবাদিককে অত্যন্ত কম বয়সে হারিয়ে ফেলা, তার অকালমৃত্যু প্রত্যেকের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। তাকে আরও প্রয়োজন ছিল সাংবাদিকতায়।
তৌফিক ইমরোজ খালিদী বিডিনিউজের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বা বিভিন্ন উপলক্ষে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানাতেন। আমিসহ আমাদের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অনেক বন্ধুরাও সেখানে অংশগ্রহণ করেছেন। সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার উচ্চবোধসম্পন্ন মানুষেরা আসতেন তার ডাকে। রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য, সংস্কৃতি—কিছুই বাদ যায়নি; সকল বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি, বন্ধুরা কথা বলেছি।
আমি নিঃসন্দেহে এসব আলাপ-আলোচনা আমার মনে থাকবে। আমি আশা করি তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ও তার সংবাদকর্মীরা তার দেখানো পথে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা চর্চা অব্যাহত রাখবে; গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ ও মূল্যবোধের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।
বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারই কেবল নয়, বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মূল্যবোধ চর্চায় বিএনপির সব সরকারই আন্তরিক ছিল। ফলে, প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দেখানো বস্তুনিষ্ঠ পথেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সংবাদের সন্ধান দেবে—এই প্রত্যাশা রাখি।
নোট: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ার অনুলিখন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: মন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মস্তিষ্কের অন্ধকারে আলোর ঝলক: ২০২৬ সালের চিকিৎসাশাস্ত্রের নোবেল
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধ: দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সমীকরণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতা
তৌফিক ইমরোজ খালিদী: আমাদের কালের কাঙাল হরিনাথ