এআই খাতে অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই। দুই কোম্পানি ব্যবসায়িক গ্রাহক, কর্মী এবং ওয়াশিংটনে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।
২০২৩ সালের মার্চে অ্যানথ্রপিক তার প্রথম লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রকাশ করে এবং সরাসরি ওপেনএআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। ছবি: রয়টার্স
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
বিশ্ব অর্থনীতিতে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের চেয়েও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গভীর পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছে অ্যানথ্রপিক। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে কোম্পানিটি বিপুল পরিমাণ অর্থ অবকাঠামো ও কম্পিউটিং সক্ষমতায় ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে।
রয়টার্সের দেখা অ্যানথ্রপিকের আইপিও প্রসপেক্টাসে এসব তথ্য উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলার। আগামী কয়েক বছরে ক্লাউড, কম্পিউটিং ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন বাধ্যবাধকতায় কোম্পানিটি ৫১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে।
এক বছরে অ্যানথ্রপিকের ব্যবসা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে কোম্পানিটির আয় প্রায় ১২ গুণ বেড়ে ৪৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে পরিচালন পর্যায়ে কোম্পানির লোকসান হয়েছে ৮০০ কোটি ডলারের বেশি। এই হিসাবের মধ্যে আগের তহবিল সংগ্রহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায় সংশ্লিষ্ট মূল্য কমবেশি হওয়ার হিসাব অন্তর্ভুক্ত নয়।
প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কম্পিউটিং ও অবকাঠামো খাতে অ্যানথ্রপিক ৭৩৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় তিন গুণ। কোম্পানিটির মোট পরিচালন ব্যয় ছিল ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ এর অর্ধেকেরও বেশি গেছে কম্পিউটিং ও অবকাঠামোতে।
অ্যানথ্রপিকের সম্ভাব্য আইপিও কোম্পানিটির মূল্যায়ন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি করতে পারে। মাত্র পাঁচ বছর আগে যাত্রা শুরু করা এআই কোম্পানিটির এই বাজার অভিষেক এআই খাতের বড় কোম্পানিগুলোর মূল্যায়নের জন্য নতুন মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআইয়ের সম্ভাব্য মূল্যায়ন নিয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে অ্যানথ্রপিকের নিজেদের গবেষণাতেই শক্তিশালী ও ক্রমশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে ওঠা এআই মডেলের অপ্রত্যাশিত ও সম্ভাব্য ক্ষতিকর আচরণের প্রমাণ মিলেছে। নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় কিছু মডেলকে কোড নষ্ট করার চেষ্টা, প্রতারণায় সহায়তা এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণে জড়িত হতে দেখা গেছে।
এসব গবেষণার তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর শক্তিশালী এআই ব্যবস্থা কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বাণিজ্যিকভাবে এসব ব্যবস্থা দ্রুত ব্যবহারের প্রতিযোগিতার মধ্যেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এসব উদ্বেগ মোকাবিলায় নতুন সক্ষমতা প্রকাশের গতি কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে গত সপ্তাহেই কোম্পানিটি নতুন মডেল ওপাস ৫.৫ প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক গতি মোকাবিলার চেষ্টা করছে অ্যানথ্রপিক।
প্রসপেক্টাসে অ্যানথ্রপিক লিখেছে, ২০২৫ সালের আয় থেকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ এসেছে মাত্র দুই গ্রাহকের কাছ থেকে। বড় গ্রাহকদের অনেকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নেই বলেও ঝুঁকির বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে কোম্পানিটি। ফলে এসব গ্রাহক চাইলে তাদের ব্যয় কমাতে বা পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেন।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর অ্যানথ্রপিকের হাতে নগদ অর্থ, নগদ সমতুল্য অর্থ ও স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ মিলিয়ে ছিল ২ হাজার ২৮ কোটি ডলার।
কোম্পানিটির সম্ভাব্য মূল্যায়ন ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। মে মাসে অ্যানথ্রপিক নিজেই যে মূল্যায়ন করেছিল, প্রায় ৯ হাজার ৬৫০ কোটি ডলার, নতুন লক্ষ্যমাত্রা তার দ্বিগুণেরও বেশি।
প্রায় ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের নিট লোকসানের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছিল হিসাবসংক্রান্ত চার্জ। এই অর্থ অ্যানথ্রপিকের ব্যবসা পরিচালনায় সরাসরি ব্যয় হয়নি। বরং ভবিষ্যতে অ্যানথ্রপিকের শেয়ারে রূপান্তরিত হতে পারে এমন অর্থায়নের মূল্য বাড়ার হিসাব এতে প্রতিফলিত হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের আইপিও এমন সময়ে আসছে, যখন এআই কোম্পানিগুলোর মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের পাশাপাশি প্রশ্নও বাড়ছে। এআই ও চিপ কোম্পানির শেয়ারে সাম্প্রতিক সময়ে বিক্রির চাপ দেখা গেছে। ফলে অ্যানথ্রপিকের উচ্চ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ও বড় মূল্যায়ন বাজারের আরও কঠোর পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।
এআই খাতে অ্যানথ্রপিকের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ওপেনএআই। দুই কোম্পানি ব্যবসায়িক গ্রাহক, কর্মী এবং ওয়াশিংটনে প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। ওপেনএআই জুনে গোপনে আইপিওর আবেদন করেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে আসতে পারে।
অ্যানথ্রপিকের প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন এমন গবেষকেরা, যারা এআই পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধের পর ওপেনএআই ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ২০২৩ সালের মার্চে অ্যানথ্রপিক তার প্রথম লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল প্রকাশ করে এবং সরাসরি ওপেনএআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে।
এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতেও অ্যানথ্রপিকের প্রতিযোগিতা রয়েছে স্পেসএক্সের এক্সএআই, অ্যালফাবেটের গুগল এবং মেটার সঙ্গে। অ্যামাজন ও গুগল অ্যানথ্রপিকের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের মধ্যে ছিল। দুই কোম্পানিই অ্যানথ্রপিকে কয়েকশ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ক্লড মডেল প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্লাউড অবকাঠামোও সরবরাহ করছে।
রয়টার্স এর আগে প্রতিবেদনে লিখেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অ্যানথ্রপিকের শেয়ারবাজারে অভিষেক পিছিয়ে যেতে পারে। এই আইপিও হলে এতদিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি, সার্বভৌম সম্পদ তহবিল ও বড় প্রযুক্তি কোম্পানির অর্থায়নে এগিয়ে চলা এআই প্রতিযোগিতায় সরাসরি সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
এদিকে এআই টুলের ব্যবহার নিয়ে অ্যানথ্রপিক ও প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বিরোধও তৈরি হয়েছে। এর জেরে পেন্টাগন অ্যানথ্রপিককে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ তালিকায় রেখেছিল। তবে আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের এক বিচারক সেই পদক্ষেপ আটকে দেন।
অ্যানথ্রপিক এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ডলারের অঙ্ক বাড়ে, শ্রমিকের হিসাব মেলে না
মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না
ডিজিটাল কলোনিয়ালিজম: আত্মপরিচয়ের সংকট ও লিঙ্গভিত্তিক সংঘাত
রাড্ডাকাণ্ড: আট মাস না পেরোতেই বড় প্রশ্নের মুখে বিএনপি