একসময় ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় যাঁর মোহনীয় উপস্থিতি ও সাবলীল অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন তৈরি করেছিল, সেই প্রখ্যাত অভিনেত্রী মিঠু মুখার্জি আর নেই। দীর্ঘকাল ধরে দূরারোগ্য ক্যানসারের সাথে লড়াই করে ৭১ বছর বয়সে মুম্বাইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। গতকাল রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে তাঁর মৃত্যু হয়। কয়েক বছর ধরে মুম্বাইয়ে সম্পূর্ণ প্রচারবিমুখ একান্তে বসবাস করছিলেন এই প্রবীণ অভিনেত্রী।
সত্তরের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে মিঠু মুখার্জির আবির্ভাব রূপালি পর্দায় এনেছিল নতুন এক প্রাণচাঞ্চল্য। তৎকালীন খ্যাতিমান নায়িকাদের ভিড়ে নিজের সহজাত অভিনয় ও রূপের সৌন্দর্যে তিনি তৈরি করেছিলেন সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি জায়গা। উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও রঞ্জিত মল্লিকের মতো শীর্ষস্থানীয় অভিনেতাদের সঙ্গে সফল জুটি বেঁধে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছিলেন তিনি। ১৯৫৫ সালের ১৯ জুন ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন মিঠু মুখার্জি।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৭২ সালে প্রখ্যাত পরিচালক চিত্ত বসু পরিচালিত `শেষ পর্ব` সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্র অঙ্গনে রূপালি অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপরের কয়েক বছরে একের পর এক দর্শকপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর অভিনয় জীবনের কালজয়ী কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে `মর্জিনা আবদুল্লা`, `মৌচাক`, `স্বয়ংসিদ্ধা` এবং `বেশ করেছি প্রেম করেছি`র মতো স্মরণীয় সিনেমা।
চরিত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিনি বারবার বৈচিত্র্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। কখনো প্রেমিকা, কখনো উচ্ছল প্রাণবন্ত তরুণী, আবার কখনো গম্ভীর পারিবারিক চরিত্রে নিজেকে ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় ও পর্দায় স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির কারণে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত অভিনয় জীবনেও তিনি দর্শকদের মনে গভীর রেখাপাত করেছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দি সিনেমা জগতেও কাজ করেছিলেন এই গুণী শিল্পী।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বলিউডে পা রাখেন তিনি। খ্যাতনামা পরিচালক দুলাল গুহ পরিচালিত `খান দোস্ত` চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হিন্দি রূপালি পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। পরবর্তীতে `দিল লাগি` ও `সফেদ ঝ্যুট`সহ বেশ কয়েকটি প্রশংসিত হিন্দি চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করেন তিনি। এ ছাড়া অভিনেতা বিনোদ মেহরার সঙ্গে একটি সফল বাংলা চলচ্চিত্রের হিন্দি রিমেকেও সমান দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন।
তবে রূপালি জগতের আলো-ঝলমলে ক্যারিয়ারকে খুব বেশি দীর্ঘায়িত করেননি মিঠু মুখার্জি। ১৯৯০ সালে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র `আশ্রিতা`। এই সিনেমাটির সফল প্রযোজনাও করেছিলেন তিনি নিজেই। এরপর ধীরে ধীরে অভিনয় এবং গ্ল্যামার দুনিয়া থেকে স্বেচ্ছায় নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন তিনি। কাজের অফুরন্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী জীবনে জনসমক্ষ ও ক্যামেরার সামনে আর কখনো আসেননি তিনি।
মিঠু মুখার্জির এই নিভৃত অন্তরালবাস অনেক চলচ্চিত্রপ্রেমীর কাছেই কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সুচিত্রা সেনের মতোই মিঠু মুখার্জিও খ্যাতির চরম শিখরে অবস্থানকালে নিজেকে দৃশ্যপট থেকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নেন এবং ব্যক্তিগত জীবনকে কঠোর গোপনীয়তায় আবদ্ধ রাখেন। ফলে জীবনের শেষ অধ্যায়গুলোতে তাঁকে ঘিরে দর্শক ও সংবাদমাধ্যমের বিপুল কৌতূহল থাকলেও তিনি আমৃত্যু আড়ালেই থেকে গেছেন। অভিনয়জীবন দীর্ঘ না হলেও বাংলা চলচ্চিত্রের সত্তরের দশকের স্বর্ণালী ইতিহাসে তাঁর নাম স্থায়ীভাবে অক্ষুণ্ণ থাকবে।