1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন

রূপসী মেঘনার ওপারে কবির গ্রাম

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৮ Time View

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে সামান্য ঢলে পড়েছে। আমরা দাঁড়িয়ে রয়েছি পান্থশালা ঘাটে। নৌকায় উঠব নাকি ফেরিতে—ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত বেছে নিলাম ছইওয়ালা নৌকা। ছইয়ের ওপরে বসলাম। উদ্দেশ্য মেঘনা নদী দেখতে দেখতে ওপারে যাব। নদীর রূপ-সৌন্দর্য দেখার লোভ সামলানো কঠিন। আমরা যারা ইটপাথরের নগরে থাকি, তাদের জন্য তো প্রায় অসম্ভব।

ঢাকা থেকে বাস, সিএনজি চালিত, অটোরিকশা—ক্ষণে ক্ষণে বাহন বদলে এসেছি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায়। আজ আমাদের গন্তব্য কবির গাঁয়ে, কবি শামসুর রাহমানের পৈতৃক ভিটা পাড়াতলীতে। রায়পুরা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে মেঘনা নদীর দক্ষিণ তীরে সবুজে ঘেরা এক শান্ত জনপদ এই পাড়াতলী। এখানে আমাদের নাগরিক কবির পৈতৃক ভিটা। এই গ্রামের আলো-বাতাস গায়ে মেখেছিলেন তিনি।

আর এই গ্রামের স্মৃতিচারণা করতে গিয়েই তো লিখেছিলেন:

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। আমাদের ‘কল-অলা নাও’ এবার চলতে শুরু করল। পানির বুক চিরে আমরা এগিয়ে চলছি। মনে পড়ে গেল কবির সেই অমর পঙ্‌ক্তি:

গাজি গাজি বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে’।

আমাদের মাঝি অবশ্য একেবারেই নিশ্চুপ। তাঁর স্থির দৃষ্টি সামনের সায়েদাবাদ ঘাটে। তিনি তো আর সেই ‘মতলব মিয়া’ নন। কবির সেই মতলব মিয়াকে পেলে হয়তো শুনতে পেতাম ‘গাজি গাজি’ ধ্বনি দিয়ে নৌকা ছোটানোর সেই উদ্দাম রোমাঞ্চ!

কবির গাঁয়ে যেতে হলে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে চড়তে হয় ‘কল-অলা’ রিকশায়। আমরাও চড়লাম। পাকা, আধা পাকা আর ইটের সর্পিলাকার সড়ক বেয়ে আমরা যাচ্ছি পাড়াতলী। চলতি পথের দুই ধারের গাছগাছালি, ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ, খোলা মাঠ, ফসলি জমি, রাস্তার ধারের টংদোকান আর হাটবাজার আমাদের মনে বাড়তি প্রমোদ যুক্ত করছে। খোলা উঠানে দল বেঁধে শিশুদের খেলাধুলা, নিষ্পাপ কিশোরীর হাতে মেহেদি আঁকার ব্যস্ততা, গৃহবধূর নিপুণ হাতে নকশি কাঁথা বোনার দৃশ্য—সব মিলিয়ে এ যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো নিখুঁত গ্রাম।

যেতে যেতে রিকশাওয়ালা মামার কাছ থেকে জেনে নিলাম কবির পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে। এক ফাঁকে গুগল থেকেও জেনে নিলাম ছোটখাটো কিছু তথ্য।

গাঁয়ের চোখজুড়ানো রূপ-শোভা দেখতে দেখতে একসময় চলে এলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। রিকশাওয়ালা মামা বাঁ হাতের ইশারায় সফেদ রঙের একটি বাড়ি দেখিয়ে বললেন—‘ওই যে কবির বাড়ি।’এগিয়ে গেলাম। পথ আটকে গেল গেটের সামনে। ইট-সিমেন্টের গেট। কাঠের বিশাল কপাট। কপাটে অযত্নের ছাপ দৃশ্যমান। আর কিছুদিন পরে হয়তো এই কাঠের কপাট আর টিকবে না। ঘুণপোকার কুরকুর আওয়াজ কানে আসছে তীব্রভাবে। তারা যেন এখানে আনন্দ-উল্লাসে বসবাস করছে। সুখী সংসার গড়ে তুলেছে।

কপাট থেকে চোখ আরেকটু ওপরের দিকে তুলতেই নজরে পড়ল গেটের দেয়ালে খোদাই করে বাংলা ও আরবি হরফে লেখা বাড়ির নাম ‘বায়তুল আমান’। নামটির ভেতরে যেন আভিজাত্যের সুবাস লুকিয়ে আছে। জানা গেল, ১৯৬৪ সালে এই বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। ভেতরে যেতে চাইলাম। কিন্তু তা আর হলো না। কেউ বাড়িতে নেই। গেটে মাঝারি আকারের একটি তালা ঝোলানো। প্রাচীরের এপাশ থেকে চেয়ে দেখলাম কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি। এখানে শেষবার তিনি এসেছিলেন ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে। পরের বছরে তিনি ইন্তেকাল করেন।

কবির পৈতৃক ভিটার উত্তর দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘বায়তুন নূর’ পাড়াতলী শাহি জামে মসজিদ। এখানকার ইমাম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, ১২৯৯ হিজরি সালে নির্মিত হওয়ার পর থেকে যুগ যুগ ধরে কবির আত্মীয়স্বজন অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এটি দেখভাল করে আসছেন। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই চমৎকার মসজিদটির সঙ্গে রয়েছে ছোট্ট মিনার। সিঁড়ি বেয়ে আমরা সেই মিনারেও উঠলাম। এরপর মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেই সবার আগে চোখ আটকে যায় এর দৃষ্টিনন্দন মিম্বরের নিখুঁত কারুকার্যে। খিলান আকৃতির অসাধারণ নকশাটি যে কারও নজর কেড়ে নেয়। নীল, লাল আর সাদা রঙের সুষম ও চমৎকার ব্যবহার পুরো কাঠামোটিকে দিয়েছে এক অনন্য রূপ ও পরিচিতি।

মসজিদের পাশেই ছিল পুকুর। পুকুরের চারপাশ গাছগাছালির ঘন সবুজে ঘেরা। স্নিগ্ধ ও শান্ত সেই পুকুরের পশ্চিম পাশে সুন্দর শানবাঁধানো ঘাট। কিছুক্ষণ পরই বিকেল নামবে, পুকুরের জলে শুরু হবে আলোছায়ার খেলা। কবি নিজেও তো এই পুকুর নিয়ে লিখেছিলেন:

১৯৭১ সালের এপ্রিলের ৭ বা ৮ তারিখের দুপুরে কবি এই পুকুরপাড়ে বসেই লিখেছিলেন বিখ্যাত দুই কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’। আত্মজীবনী ‘কালের ধুলোয় লেখা’য় তিনি বলেছেন—যখন তাঁর মাথায় কবিতাগুলো এল, তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ুয়া চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে কাগজ ও কাঠপেনসিল চেয়ে নিয়ে এক টানে লিখে ফেলেন কবিতা দুটি।

এই শান্ত পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির এক গভীর বিষাদের স্মৃতি। এতে ডুবেই ১৯৭৬ সালে মারা গিয়েছিল তাঁর কিশোর বয়সী ছেলে ওয়াহিদুর রাহমান। কবি যাকে আদর করে ডাকতেন ‘মতিন’ বলে। পুত্রশোকে কবি লিখেছিলেন—

মসজিদের উত্তরের দেয়াল ঘেঁষে কবরস্থান। কবির পারিবারিক কবরস্থান এটি। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত কবির আত্মীয়স্বজন আর আদরের মতিন।

বায়তুল আমানের ভেতরে আর যাওয়া হলো না। কবির বাড়ি পেছনে ফেলে আমরা যাচ্ছি পাড়াতলী বাজারে। সেখান থেকে অটোরিকশায় ঘুরব আশপাশের গ্রাম—কাচারীকান্দী, মধ্যনগর, কালিপুর, আলীনগর, বাঁশগাড়ি। রাতের ঢাকায় তো অনেক ঘুরলাম। এবার দেখি রাতের গ্রাম কতটা উপভোগ করা যায়।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ