1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন

নাটক একটি অদ্ভুত নেশা

Reporter Name
  • Update Time : বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬
  • ৭ Time View

একুশে পদকজয়ী প্রখ্যাত অভিনেত্রী নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকার সারা যাকের । বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটির চেয়ারপারসনও তিনি। গতকাল ছিল তার জন্মদিন। এ উপলক্ষে তার জীবনের গল্প শুনেছেন ওমর শাহেদ । অাপনার জন্ম কোথায় ? আমার আব্বা মেজর ( অব .) সালাউদ্দিন মোহাম্মদ আমিনের ছিল বদলির চাকরি। ব্রিটিশ আর্মি থেকে পাকিস্তান আর্মিতে কাজ করেছেন। আম্মা আলিয়া আমিন ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষিকা ছিলেন। আমার জন্মের সময় আব্বা ছিলেন পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের স্টাফ কলেজে। সেখানে ১৯৫৪ সালের ২১ অক্টোবর আমার জন্ম। আমরা দুই ভাই ও দুই বোন। বড় ভাই আলাউদ্দিন মোহাম্মদ জহিন সাড়ে ২০ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যাওয়ার পথে খুন হন। তার ডাকনাম ছিল চিংকু। আরেক ভাই জাহিরউদ্দিন মোহাম্মদ আলিম ও ছোট বোন ড . সাজেদা অামিন আমেরিকায় থাকে। মা – বাবার কোনো প্রভাব আপনার ওপর পড়েছে ? আব্বা – আম্মা দুজনেই খুব বই পড়তেন। পরিবারের সবারই বই পড়ার অভ্যাস আছে। এই অভ্যাস থেকে আমার মধ্যে বই পড়ার তাগিদ তৈরি হয়েছে। তবে পরিবারের অন্যদের তুলনায় ছোটবেলায় আমি বই কমই পড়েছি। লেখাপড়া শুরু হলো কীভাবে ? আব্বার চাকরিসূত্রে আমরা তখন যশোরে ছিলাম। সেখানে দাউদ পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে আমার শিক্ষাজীবন শুরু। এরপর আব্বাকে আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিতে হলে আমরা ঢাকায় চলে আসি। এখানে এসে আমি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হলাম। এখান থেকেই ম্যাট্রিক পাস করেছি ; তারপর হলি ক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি। কলেজে পড়ার দুই বছরের মধ্যে আলী যাকেরের সঙ্গে প্রেম। তারপর আমরা পরস্পরকে পছন্দ করে বিয়ে করেছি। আমি ছিলাম সায়েন্সের ছাত্রী। প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রিতে ভর্তি হয়ে এক বছর পড়েছি। এ সময়ে গর্ভধারণ করলাম। ততদিনে নাটকও করছি ; তখন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হলো — অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় নাটক , পড়াশোনা , প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতে পারব কি না। বিজ্ঞানের পড়াশোনার চাপ কমাতে তাই ইংরেজি বিভাগে ট্রান্সফার হলাম। আপনি তো ভালো ছাত্রী ছিলেন। দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি — উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের পারিবারিকভাবে ঐতিহ্য ছিল , যেমন করেই হোক ফার্স্ট ডিভিশন পেতে হবে। বাড়িতে গৃহশিক্ষক রাখা হতো না। তবু ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়ার জন্য সবরকম চেষ্টা চালিয়ে গেছি। এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যুক্ত হয়েছি এসএসসির পর। তখন আমাদের নাট্যদল থেকে বছরে দু – তিনটি নাটক হতো। সেগুলোর চাপ সামলিয়ে এইচএসসিতেও ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও আমার ফল ভালো ছিল। আমাদের অঙ্গীকার ছিল আমরা মঞ্চের মাধ্যমে দেশকে পরিচয় করাব। ফলে নিয়মিত নাটক করেছি। তখন আমার ১৮ বছর বা তারও কম বয়স ছিল। এখন তো কেউ অঙ্গীকারের কথা ভাবে না! কিন্তু আমাদের যুগে সেটি ছিল। বিয়ে যেমন অঙ্গীকার, নাটকে কাজ করার ব্যাপারেও আমাদের তেমনটাই ছিল। সুতরাং আমাকে নাটক করে যেতে হয়েছে ছোটবেলায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের প্রতি আগ্রহ ছিল ? ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পাকিস্তান আমল থেকেই প্রতি বছর খুব ভালোভাবে পহেলা বৈশাখসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অায়োজিত হতো। মঞ্চের প্রতি , সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভীষণ আগ্রহ ছিল। তখন থেকেই সব স্কুল প্রোগ্রামে অংশ নিতাম। যশোর থেকে ঢাকায় আসার পর আব্বা – আম্মা আমাদের বাফায় ( বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ) ভর্তি করে দিয়েছিলেন। সেখানে গান শিখতাম। স্কুলের মিলাদ অনুষ্ঠানে নাত গাইতাম। আমার গানের গলা ভালোই ছিল। ‘ রাগরুপা ’ নামে একটি নাচের স্কুলেও ভর্তি হয়েছিলাম। আমরা তখন ধানমন্ডিতে থাকতাম। কিন্তু যখন ইস্কাটনে চলে এলাম , তখন কে আমাকে নিয়ে যাবে স্কুলে ? এই টানাপড়েনে নাচ আর গান সেরকম শেখা হয়নি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ছায়ানটে আবার গানের ক্লাসে ভর্তি হয়েছি। নাটকের প্রতি আগ্রহী হলেন কীভাবে ? চিংকু ভাইয়া নাটক করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি সংসদে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৯ কিংবা ১৯৭০ সালে আবুল হায়াত ভাই আর সৈয়দ হাসান ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে টিএসসিতে নাটক করেছেন। মূলত ইংরেজি নাটকই করতেন চিংকু ভাইয়া। রয়েল একাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টে পড়ার জন্য লন্ডনে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু যুদ্ধে গিয়ে তিনি তো আর ফিরে এলেন না ! তাই ভাবলাম , আমি যদি নাটক করি , তাহলে চিংকু ভাইয়ার স্মৃতি কিছুটা ধরে রাখা যাবে। আব্বার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল ( অব .) কাজী নুরুজ্জামান ( বীরউত্তম ) । তারা খুব সচেতনভাবে বাড়ির মেয়েদের গান , নাচ ও বাংলা শিখিয়েছেন। স্বাধীনতার পর আব্বাকে তিনি বলেছিলেন , ‘ তোর মেয়েকে নাটকের দলে দে। তাহলে ওর বাংলার চর্চা আরেকটু ভালো হবে। ’ আব্বা রাজি হলেন। সুন্দর করে বাংলা বলব , বাংলা চর্চা করব — দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি ছিল খুব গর্বের ব্যাপার। এই মূল্যবোধ সবার মধ্যেই ছিল। তার মেয়ে ডা . নায়লা জামান খান কিছুদিন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে যুক্ত ছিলেন। আমাদের প্রথম নাটক বাদল সরকারের ‘ বাকি ইতিহাস ’- এ অভিনয় করেছেন। জামান আঙ্কেল বলার পর একদিন আলী যাকের ও আতাউর রহমান ভাই আমাদের বাসায় এলেন। আব্বা তাদের রীতিমতো ইন্টারভিউ নিলেন। এভাবে তাদের মাধ্যমে আমি নাটকের দলে যোগ দিয়েছি। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়েই আলী যাকেরের সঙ্গে আমার পরিচয়। মহিলা সমিতিতে আপনাদের নাটক প্রদর্শনীর শুরু কীভাবে ? ব্রিটিশ কাউন্সিলে ‘ বাকি ইতিহাস ’ কে দর্শনীর বিনিময়ে মঞ্চে আনার পরিকল্পনা যখন চলছিল , সেখানে কয়টি বুকিং নেব — এ নিয়ে একদিন আমরা আলোচনায় বসলাম। দলের সবাই মিলে আটটি রবিবারের সকালে বুকিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কেননা , তখন রবিবারই ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। এর পর থেকে সেখানে নিয়মিত মঞ্চনাটক শুরু হলো। কিছুদিন পর ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে জানানো হলো , সেখানে যেহেতু ও – লেভেল , এ – লেভেলের পরীক্ষা হয় , তাই আমাদের এরকম নিয়মিতভাবে নাটকের জন্য জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়। তখন আমি বললাম , “ একটি মঞ্চ আছে। সেটি পাকিস্তান আমলে ছিল অল পাকিস্তান উইমেন্স অ্যাসোসিয়েশন। ওখানে আমরা স্কুল থেকে প্রোগ্রাম করেছি। মিলনায়তনটি খুব ভালোভাবে চিনি। আমার ভাই অভিনীত ‘ মিসানথ্রোপ ’ ( মলিয়ের রচিত ) নাটকও ওখানে মঞ্চায়িত হয়েছে। ” আমার কথা শুনে আলী যাকের মঞ্চটির বিভিন্ন অংশ মেপে আনার জন্য একটি টেপ দিল। আমি এক কাজিনকে সঙ্গে নিয়ে মেপে নিয়ে এলাম। তারপর নাটকের জন্য মহিলা সমিতির বুকিং নেওয়া হলো। অন্য নাটকের দলগুলোও তখন এখানে নাটক প্রদর্শনী শুরু করল। গাইড হাউজের মঞ্চটিও অনেক বছর ব্যবহার হয়েছে। দুটোই পাশাপাশি। যে কারণে ওই রাস্তার নাম হয়েছিল ‘ নাট্যসারণী ’ । এখন অবশ্য এ মঞ্চ অতটা ব্যবহার হয় না ; কিন্তু হওয়া উচিত বলে মনে করি। মঞ্চে আপনার অভিনয় শুরু ‘ বাকি ইতিহাস ’- এর মাধ্যমে ? ‘ বাকি ইতিহাস ’- এ ‘ কণা ’ চরিত্রে। তারপর অ্যালবেয়ার কামুর ‘ ক্রস পারপাস ’ । এরপর কাজ করেছি ‘ সৎ মানুষের খোঁজে ’ তে। এটি আমার নাটকের জীবনে একটি ব্রেকথ্রু ছিল। এই নাটকে দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছি। একটি নারী আর অন্যটি পুরুষ — ফুলি আর ফুল মোহাম্মদ। আলী যাকেরের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ১৯৭৫ সালে। বিয়ের পরপর ১৯৭৫ ও ১৯৭৬ সালে আমরা ‘ সৎ মানুষের খোঁজে ’ করেছি। মঞ্চে আপনার স্মরণীয় চরিত্র এটিই ? স্মরণীয় অভিনয় বলতে দর্শকের মধ্যে অনেক উৎসাহ তৈরি করেছিল নাটকটি। মুস্তাফা মনোয়ার এটিকে টেলিভিশনে ডিরেকশন দিয়ে প্রডিউসও করেছেন। ক্যামেরায় যারা ছিলেন , তারা এত কাছে থেকেও কিন্তু বুঝতেই পারেননি আমি সেই মেয়ে ও ছেলের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র করছি। এরপর কোন কোন নাটকে অভিনয় করেছেন ? তারপর ‘ দেওয়ান গাজীর কিসসা ’ । এখানে তিন বারবণিতার মধ্যে প্রথমজন চামেলী চরিত্রটি আমার। দ্বিতীয় বারবণিতার চরিত্রে ছিলেন রওশন আরা হোসেন ; তৃতীয়জন লাকী ইনাম। আমরা তিনজন তিনরকম বলে ক্যারেক্টারাইজেশনে নিজস্ব একটি শক্তি তৈরি হয়েছিল। তার পরে সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘ ঈর্ষা ’ তে কাজ করেছি। তিন চরিত্রের নাটক। যুবতী চরিত্রটি আমার। খালেদ খান আর জামালউদ্দিন হোসেন ছিলেন। ‘ ম্যাকবেথ ’- এ অভিনয় করেছি। এই নাটকে ব্রিটিশ পরিচালক ক্রিস্টোফার স্যানফোর্ডের নির্দেশনায় অভিনয় করেছি। পূর্ব জার্মানি থেকে আসা ফ্রিৎস বেনেভিৎসের নির্দেশনায় ‘ লোক সমান লোক করেছি ’ । এটি আইটিআইয়ের ( ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট ) নাটক ছিল। তিনি আমাদের বার্টোল্ট ব্রেখটের এপিক মেথডে অভিনয় কৌশল রপ্ত করিয়েছেন। ভারতীয় নাট্যপরিচালক উষা গাঙ্গুলীর নির্দেশনায় ‘ নামগোত্রহীন ’- এ অভিনয় করেছি ২০১৪ সালে। তার ডিরেকশনে এই নাটকে আমাদের পুরো দলকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল। তিনি মেথড অ্যাক্টিং নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। মাঝখানে তো বিদেশেও গিয়েছিলেন ? ১৯৮১ সালে নির্দেশনার একটি কোর্স করতে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলাম। ব্রিটিশ থিয়েটার ইনস্টিটিউটের ( বিটিআই ) আড়াই মাসের কোর্স ছিল সেটি। এই ইনস্টিটিউট এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না কোথাও। কিন্তু তখন তারা এই নির্দেশনার কোর্সে অনেক নাটক দেখিয়েছে। নাটকগুলোর ওপর আলোচনা হয়েছে। সেখান থেকে বেশ কিছু জিনিস শিখেছি। দেশে ফিরে স্কলাস্টিকা স্কুলের বার্ষিক নাটক ‘ অবাক জলপান ’- এর নির্দেশনা দিয়েছি। নাটকটি দেখার পর অনেকে বলেছিলেন , আমার ডিরেক্টোরিয়াল হাতটি আছে। এরপর আমার নির্দেশনায় ১৯৯৪ সালে মঞ্চে এসেছে ‘ মুখোশ ’ । এরিয়েল ডরফম্যানের লেখা এই নাটক রূপান্তর করেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। এখানে অভিনয় করছিলেন নিমা রহমান , আবুল হায়াত ভাই আর আসাদুজ্জামান নূর ভাই। নাটকটি খুবই সমাদৃত হয়েছিল , তাতে আমি অবাক হয়েছিলাম। এরপর ‘ দুঃখিনী ’ করেছি। এটি পাকিস্তানের আজোকা থিয়েটার ও চট্টগ্রামের বিটার ( বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টস ) যৌথ প্রযোজনা। মেয়েরা বাংলাদেশের আর ছেলেরা পাকিস্তানের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি নেপাল ও পাকিস্তানেও এই নাটকের প্রদর্শনী করেছিলাম। শেষে নিজেরই অনুবাদ , অভিনয়ে ও ডিরেকশনে করেছি ‘ ওপেন কাপল ’ । অভিনয় অবশ্যই পছন্দ করি , সব নাটকেই অভিনয় করতে ভালো লেগেছে। তবে আমার মনে হয় , অভিনয়ের চেয়ে নির্দেশনাতেই আমাকে বেশি মানায়। টিভি নাটকে কীভাবে এলেন ? টিভি নাটকে অভিনয়ের জন্য বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব পেয়েছি। প্রথম অভিনয় করেছি জিয়া আনসারীর সিরিজ নাটক ‘ পূর্বরাত্রি পূর্ব দিন ’- এ। সালেক খানের পরিচালনায় এক ঘণ্টার নাটক ‘ নীল পদ্ম ’ তে অভিনয় করেছি। তবে হ ‍ ুমায়ূন আহমেদের ‘ অয়োময় ’- এ এলাচি বেগম চরিত্রে অভিনয়ের কারণে মানুষ আমাকে বেশি চিনেছে। ‘ জোছনার ফুল ’ নাটকটি করেছি নূর ভাইয়ের সঙ্গে। এই নাটক মঞ্চে আমি আর আলী যাকের করতাম। এরপর প্যাকেজ নাটক যুগ এলো। সেখানে অনেক সময় দিতে হয়। আমার তো অফিস ( এশিয়াটিক ) করতে হয়। কীভাবে এরকম করে প্যাকেজ নাটক করব ? ফলে কোনো প্যাকেজ নাটকেই অভিনয় করিনি। টেলিভিশনের জন্য বেশ কয়টি নাটক লিখেছিলাম — ‘ ঈদ ভেকেশন ’, ‘ রুদ্রের সাথে বসবাস ’, ‘ জাহানারার কথা ’ ইত্যাদি। এখন কী করছেন ? ‘ আলী যাকের নতুনের উৎসব ’- এ আবার নাটক নিয়ে কাজ করছি। এই নাটকের নাম ‘ দর্পণ ’ । এটি আলী যাকের নির্দেশনা দিয়েছিল ১৯৯০ – ১৯৯১ সালে। এশিয়াটিকের বনানীর অফিসের ওপরে আলী যাকের স্মরণে আমরা একটি স্পেস তৈরি করেছি। এর নাম দিয়েছি ‘ বাতিঘর ’ । সেখানে এখন নাটকটির রিহার্সেল হচ্ছে। অনেক দিন পর আমি নাটকের রিহার্সেল দেখতে গেলাম। খুব ভালো লাগল। দেড় ঘণ্টা ধরে রিহার্সেল দেখলাম। একমুহূর্তও মনে হয়নি , আচ্ছা যাই এখন। কেননা , নাটক একটি অদ্ভুত নেশা। মঞ্চ দেখলে মাথায় আরও আইডিয়া আসে। এশিয়াটিকের মতো বড় একটি প্রতিষ্ঠান সামলে আপনারা কীভাবে নাটক করতেন ? এখন এই প্রতিষ্ঠানে অনেক বেশি সময় দিতে হয়। আর তখন নাটকের জন্য আমরা পাগল ছিলাম। এশিয়াটিকের প্রথম কর্ণধার আলী যাকের নিজেও খুব টেনশন করার মতো মানুষ ছিল না। আমরা চাকরির মতো করেই এই কোম্পানিতে ৯টা – ৫টা কাজ করেছি। চাকরির পর রিহার্সেল করতে যেতাম। আই থিংক আলী যাকের বিলিভড ইন বিল্ডিং লিডারস , যে কারণে আমার ওপর একটি রিসার্চ কোম্পানির দায়িত্ব দিয়েছিল। আজকের যে প্রজন্ম প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছে — আমার ছেলে ( ইরেশ যাকের ), মেয়েসহ ( শ্রিয়া সর্বজয়া ) বাইরের ছেলেমেয়েরা আছে ; তাদের তৈরি করে দিয়েছে আলী যাকের। ও কোনো বিষয়ে খুব নাক গলাত না কোনোকালেই। স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিত। তবে ভালো চালাতে হবে অবশ্যই — এই ছিল ওর চাওয়া। এরকম একটি প্রতিষ্ঠান আপনারা কীভাবে তৈরি করছেন ? এটি ধীরে ধীরে আমাদের অজান্তেই হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো চালাতে নেতৃত্ব তৈরি করেছে আলী যাকের। তার ভিশন ছিল বলেই এভাবে তৈরি হয়েছে। কিন্তু এটি যদি একজন মানুষের দায়িত্বে কিংবা তার ছেলেমেয়ে চালাবে — এমন ফ্যামিলি বিজনেস হতো , তাহলে এভাবে গ্রো করত না বলে আমার ধারণা। আলী যাকেরের সঙ্গে আপনার দাম্পত্য জীবনের স্মৃতি জানতে চাই। আমি যে সংসার করব , রান্নাঘরে যাব — এ ধরনের কোনো প্রত্যাশা ওর ছিল না। আমি ঘর গোছাতে খুব পছন্দ করি। দেখা গেল , বাসা থেকে বের হওয়ার সময় পর্দা কিংবা পেইন্টিং ঠিক করছি , এ নিয়ে সে একটু ঠাট্টা করত। ওর মা তো খুব ভালো রান্না করতেন। খুব ভালো রান্না খাওয়া ওর অভ্যাস ছিল। কিন্তু আমি যে রান্নাঘরে যাই না , এ নিয়ে ওর মাথাব্যথা ছিল না। এখন আবার খুব রান্না করার শখ হয়েছে আমার। ওকে খুব মিস করি। মনে হয় , এই যে এখন রান্না করছি বা আমার রান্নাঘরে যেতে ভালো লাগে — এটি দেখলে হয়তো ওর ভালোই লাগত। আপনার অভিনয়ে তার কোনো অনুপ্রেরণা আছে ? অবশ্যই আছে। আমাদের অঙ্গীকার ছিল , আমরা মঞ্চের মাধ্যমে দেশকে পরিচয় করাব। ফলে নিয়মিত নাটক করেছি। তখন আমার ১৮ বছর বা তারও কম বয়স ছিল। এখন তো কেউ অঙ্গীকারের কথা ভাবে না ! কিন্তু আমাদের যুগে সেটি ছিল। বিয়ে যেমন অঙ্গীকার , নাটকে কাজ করার ব্যাপারেও আমাদের তেমনটাই ছিল। সুতরাং আমাকে নাটক করে যেতে হয়েছে। এই জায়গায় আমার আর ওর দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল। যদিও সে অভিনেতা হিসেবে ফার সুপিরিয়র ; নিজে তো বলতে পারতাম , আমি অভিনেতা হিসেবে অত ভালো নই। তাহলে লেট মি ট্রাই সামথিং এলস। কিন্তু সেই জায়গায় যাইনি। আমিও অভিনয় করেই গিয়েছি। টেলিভিশনের নাটকে অবশ্য তেমন সময় দিতে পারিনি ; যেমন হ ‍ ুমায়ূন আহমেদ ভাই যখন আমাকে ‘ অয়োময় ’- এ অভিনয় করতে বললেন , ততদিনে মঞ্চে আমার ২০ বছর কাজ করা হয়ে গেছে। এটিও ঠিক , তখন আমার ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে। আমি সদ্যই এসএসসি পাস করে মঞ্চনাটক শুরু করেছি। এরপর এইচএসসি , অনার্স , মাস্টার্স — সবই তো আমাকে করতে হয়েছে। অভিনেতা ও নির্দেশক হিসেবে আলী যাকের কেমন ছিলেন ? আমি মনে করি , সে খুবই ভালো অভিনেতা , ভীষণ ন্যাচারাল। অভিনয় করতে খুবই ভালোবাসত। নির্দেশক হিসেবেও দারুণ। ওর খুব সিম্পল পরিকল্পনা ছিল। চিন্তাভাবনা – কল্পনা খুব সিম্পল ওয়েতে করত। একজন নির্দেশকের মাথায় খুব ক্লিয়ার ভিশন থাকা উচিত। সেটি ওর খুব ভালো ছিল। পাত্রপাত্রীদের টেনশনে ফেলত না। আমাদের অনেকেই নির্দেশনার সময় বকাঝকা দিতেন। কিন্তু আলী যাকের কোনো কঠোর নির্দেশক ছিল না। যেরকমভাবে কোম্পানিটিকে বড় করে তুলেছে , সেরকমভাবেই যখন নির্দেশনা দিত , নাটকটি আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে যেত। সেটি কেউ অনুভবও করত না। আমি মনে করি , নেতা হিসেবে এটি ওর সবচেয়ে বড় গুণ। স্বামী হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন ? আমার শ্বশুর – শাশুড়ি খুব সংসারী ছিলেন। মা রান্না করছেন , বাবা অফিস করছেন ; আলী যাকের খুব ভালো একটি সংসার দেখে বড় হয়েছে। ও খুবই সংসারী মানুষ ছিল। ‘ তুমি রান্নাঘরে কেন যাও না ’— কোনোদিন ভুলেও এই কথা বলেনি আমাকে। আমরা একসঙ্গে নাটকের যাত্রা শুরু করেছি দেখে হয়তোবা বলেনি। ভেবেছে , আর কত কিছু আমি রপ্ত করব ? পড়াশোনাতেও উৎসাহ দিয়েছে। ( ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , গুলশান – ২ , ঢাকা )

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ