বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। গ্যাস সংকট, লোডশেডিং ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, ব্যাহত হচ্ছে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম। চাপে পড়ছেন রপ্তানিকারকরা। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোয় চলে যেতে পারে। গতকাল নিউইয়র্কভিত্তিক সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৫০ শতাংশ এবং ডিজেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর খোলাবাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রায় তিন গুণ হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের ঘাটতির কারণে জ্বালানি সরবরাহের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। দেশের মোট জ্বালানির প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালির আশপাশে অস্থিরতা এবং দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে জুলাই ও আগস্টে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
টাইম ম্যাগাজিন বলছে, বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে। দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারে কাটছাঁট করেছে। গ্রামাঞ্চলের কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কারখানাকে বিকল্প হিসেবে ব্যয়বহুল ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
হা-মীম গ্রুপের তৈরি পোশাক কারখানায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী টাইমকে বলেন, দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটে। গ্যাসের পর ডিজেলই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি; গ্রিডের বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে। হা-মীম গ্রুপের প্রায় ৯০ হাজার কর্মী প্রতি মাসে ৯৩ লাখ পোশাক তৈরি করেন। গ্যাপ, আমেরিকান ঈগল ও জেসি পেনির মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানটির ক্রেতা। জ্বালানি সংকটের মধ্যেও উৎপাদনশীলতা ধরে রাখার ওপর জোর দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। কারণ, উৎপাদন ব্যয় বাড়লে কিংবা নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে ক্রেতারা বিকল্প দেশের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পোশাকশিল্পের সংকটের প্রভাব রপ্তানির বাইরেও বিস্তৃত। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ শিল্পে কাজ করেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। ফলে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক খাদ্যনিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ শিগগিরই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন।
সংকট মোকাবিলায় গত মাসে সরকার নতুন জ্বালানি রূপরেখা প্রকাশ করেছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ ও কয়লাভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ১২ হাজার ৯৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে ৩০০টি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৩১টি কূপ খনন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম পরিকল্পনাটি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তার আশা, আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ সংকটের অবসান হতে পারে। তবে আপাতত স্বস্তির লক্ষণ কম। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন ব্যয় ও পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বাড়তে পারে।
ফতুল্লা অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে শামীম এহসান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের জন্য কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না থাকলে পরিস্থিতি অনেক ভালো হতো। জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন বজায় রাখাই এখন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।