ব্যাংকে একক পরিবারের নিয়ন্ত্রণ কমাতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বেশ কিছু ছাড় দিচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। একজন পরিচালকের টানা মেয়াদের সীমা ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৯ বছর করার প্রস্তাব রাখা হলেও, পর্ষদে একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ ৩ জন পরিচালক রাখার বিদ্যমান নিয়ম অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা সর্বশেষ খসড়ায়, একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা ৩ জন থেকে কমিয়ে ২ জন করা এবং টানা সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) দুটি প্রস্তাবই বাতিল করে দিয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে 'ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৬'-এর খসড়া পুনর্বিবেচনা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্ব ও পরিচালকদের মেয়াদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধান বহাল রেখে, খসড়াটি পুনর্গঠন করে আবার মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি খেলাপি ঋণ থাকা পরিচালকদের ক্ষেত্রেও নিয়ম শিথিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতার ধারায় পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। এসব পরিবর্তন এনে খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক পর্যালোচনা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিরা ব্যাংকের পর্ষদে একই পরিবারের সর্বোচ্চ তিনজনকে পরিচালক হিসেবে রাখার বিধান বহাল রাখার বিষয়ে একমত হন। তবে টানা মেয়াদের ক্ষেত্রে বর্তমান ১২ বছরের স্থলে ৯ বছর করার বিষয়ে তারা সম্মতি প্রকাশ করেন।
উক্ত বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বিএবি, বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-সহ ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় রেখে কঠোর প্রস্তাবগুলোর কয়েকটি শিথিল করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা সম্মত হয়েছেন।
'পারিবারিক ব্যাংক' গঠনের ঝুঁকি দেখছেন সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানান, সংশোধনী আইনের মূল খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগ আমলে দল সমর্থিত ব্যাংক মালিকেরা সব ধরনের ব্যবসায়িক নিয়মকানুন এড়িয়ে, সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে আইন পাস করিয়ে নিয়েছিলেন—যার মাধ্যমে একই পরিবারের ৩ জন সদস্য পর্ষদে বসার এবং এক পরিচালকের টানা ১২ বছর পদে থাকার সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময়ও এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল না।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার যাতে একটি ব্যাংককে নিজস্ব সম্পত্তি মনে করতে না পারে, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতেই এসব সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছিল।
"যদি এই সংশোধনীগুলো না আনা হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা ব্যাহত হবে। অতীতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করত, আর এখন বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করবে। ব্যাংকগুলো আবারও সেই পারিবারিক ব্যাংকে রূপ নেবে," বলেন আহসান মনসুর।
এ ছাড়া আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, এই বিভাগটি বিলুপ্ত করার আলোচনা বারবার হয়েছে এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এটি বিলুপ্তির প্রতিশ্রুতি ছিল।
পরিচালকদের ঋণ সমন্বয়ের বিধানেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বর্তমান আইনে কোনো পরিচালকের নিজ নামে নেওয়া ঋণ, অথবা তার গ্যারান্টিকৃত ঋণ খেলাপি হলে—উক্ত পরিচালক ঋণ নিয়মিত করার জন্য ২ মাসের সময় পান। এই ২ মাসের মধ্যে ঋণ নিয়মিত করতে না পারলে, তিনি পরিচালক পদ হারান এবং তার শেয়ার বিক্রি করে ঋণ নিয়মিত করার নিয়ম রয়েছে। এ ছাড়া ওই ঋণ পরিশোধের এক বছর পর, তিনি আবার যে ব্যাংকে পরিচালক ছিলেন— সেই ব্যাংকে বা অন্য ব্যাংকে পদ খালি থাকা সাপেক্ষে পরিচালনা পর্ষদে ফেরার সুযোগ পান।
বাংলাদেশ ব্যাংক তার খসড়ায় পরিচালকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও পরিচালক পদ হারাবেন বলে নতুন নিয়ম রাখার প্রস্তাব করেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রস্তাব রাখা হচ্ছে না। পাশাপাশি পরিচালক পদে ফেরার সময়সীমা কমিয়ে ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় এবং নোটিশে ঋণ নিয়মিত করার সময় বাড়িয়ে কমপক্ষে ৬ মাস করার সুপারিশ এসেছে ব্যাংকের মালিকদের পক্ষ থেকে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়ে খসড়ার ধারাটি আরও পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ, ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় রেখে— প্রস্তাবিত কিছু কঠোর বিধান পুনর্বিবেচনা ও শিথিল করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত হয়েছেন।
পরিবারতন্ত্র ঠেকাতে উদ্যোগ, শেষ পর্যন্ত শিথিল
ব্যাংকখাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও পরিবারতন্ত্র নিয়ন্ত্রণে, ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা কমিয়ে ২ জনে নামানোর প্রস্তাব করা হয় খসড়ায়।
ব্যাংক-কোম্পানী আইনের ১৫(১০) ধারা অনুযায়ী, বর্তমানে একই পরিবারের সর্বোচ্চ ৩ জন সদস্য একই সময়ে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকতে পারেন। এর বাইরে ওই পরিবারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বোচ্চ দুটি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
তবে বিএবিসহ কয়েকটি পক্ষ বর্তমানের ৩ জনের সীমা বহাল রাখার বিষয়টি বিবেচনার অনুরোধ করেছে। ফলে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর পরিকল্পনা টিকছে না।
এ ছাড়া ব্যাংক পরিচালকদের একটানা মেয়াদ কমানোও—সংশোধনী খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল।
পরিচালকদের মেয়াদের ক্ষেত্রে, ২০১৮ সালে একটানা মেয়াদের সীমা ৬ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছিল। ২০২৩ সালের সংশোধনীতেও ওই ১২ বছরের মেয়াদ রেখে দেওয়া হয়, যেখানে ১২ বছর পর ৩ বছরের বিরতি শেষে পুনরায় ফেরার বিধান ছিল। তবে এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রস্তাবিত ৬ বছরের মেয়াদের বিরোধিতা করে বিএবি।
বিএবির পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, পরিচালকদের মেয়াদ অতিরিক্ত কমিয়ে দিলে—ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন পরিচালকদের ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় তুলে ধরা হয়।
ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক আধিপত্য কমাতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সে অনুযায়ী, সংশোধিত আইনের খসড়া প্রস্তুত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনটি সংশোধন নিয়ে গত ৮ এপ্রিল, ২২ এপ্রিল ও ১২ জুলাই তিনটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভার আলোচনার ভিত্তিতে খসড়ায় বিভিন্ন সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন করে, তা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের জন্য থাকছে না কোনো সীমা
খসড়ায় ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধনের সীমা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, তবে এ ধরনের বিনিয়োগে সরকারি অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে।
সংকটগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত 'সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক'-এর বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজনীয়তা থেকে এই প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকটির কৌশলগত অংশীদার হওয়ার জন্য সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাতারের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তুতি চলছে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, "কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা মূলত বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন বা ইক্যুইটি সরবরাহ করবে। একই সঙ্গে ব্যাংকের সুশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি ভূমিকা থাকবে। এ কারণে তাদের বিনিয়োগের নির্দিষ্ট সীমা না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।" তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি ব্যাংকেরও এ ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হতে পারে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ ধারায় পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে, যা আমানতকারী বা ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের প্রমাণ পেলে—বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরো পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেখানে প্রশাসক বা উপযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে বসাতে পারে।