দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কক্সবাজার ও পেনাংয়ের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা নিশ্চিত করেছে মালয়েশিয়ার সুলভ মূল্যের বিমান সংস্থা এয়ার এশিয়া।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস'কে বলেছেন, 'এয়ার এশিয়া কক্সবাজারে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করবে বলে নিশ্চিত করেছে।' প্রস্তাবিত এই ফ্লাইট কক্সবাজারকে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের সঙ্গে যুক্ত করবে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি মাসে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের প্রস্তুতির মধ্যেই এ অগ্রগতি হলো। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার থেকে বিদেশি এয়ারলাইন্সকে আকৃষ্ট করে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, 'বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ফ্লাইট পরিচালনা করবে।'
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজারকে আঞ্চলিক পর্যটন ও বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার একই সঙ্গে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুট চালুর জন্য কাজ করছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থলবেষ্টিত নগরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, 'আমরা কক্সবাজার-কাঠমান্ডু-কক্সবাজার রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালুরও পরিকল্পনা করছি। চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের সঙ্গেও কক্সবাজারের সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ চলছে। চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের পর্যটকদের আকৃষ্ট করাই এর মূল লক্ষ্য।
কক্সবাজারের সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেও পর্যটক আকর্ষণের সুযোগ সরকার খতিয়ে দেখছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, কক্সবাজারকে শুধু দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল একটি গন্তব্যের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রস্তাবিত এসব রুটকে।
তবে এয়ার এশিয়া কবে থেকে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করবে, কিংবা সপ্তাহে কতটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু এখনই জানাননি মন্ত্রী।
এয়ার এশিয়ার এই আগ্রহকে কক্সবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন বিমান পরিবহন ও পযর্টনমন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ চালুর লক্ষ্যে সরকার বিমানবন্দর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সকে যুক্ত করার উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে।
এর আগেও মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজার থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক রুট চালুর জন্য সরকার আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
সর্বশেষ এই উদ্যোগে সেই প্রচেষ্টায় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এয়ার এশিয়া কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্ভাব্য বিদেশি অপারেটর হিসেবে সামনে এসেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধানে প্রস্তুতি শেষে কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত যাত্রী টার্মিনাল গত সোমবার থেকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে।
বেবিচকের সদস্য (অপারেশন্স অ্যান্ড প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান বাসস'কে বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন টার্মিনালে প্রাথমিকভাবে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের সেবা দেওয়া হবে। পরে এটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক যাত্রীদের আগমন ও বহির্গমন নতুন টার্মিনাল দিয়ে হবে। তবে অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের আগমন বর্তমান টার্মিনাল দিয়েই হবে । অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রীরা নতুন টার্মিনালে চেক-ইনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর পুরোনো টার্মিনালে গিয়ে বিমানে উঠবেন।
প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালটি প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে চেক-ইন কাউন্টার, ইমিগ্রেশন সুবিধা, লাগেজ সরবরাহের বেল্ট, নিরাপত্তা তল্লাশি সরঞ্জাম, লিফট, এসকেলেটর এবং বোর্ডিং ব্রিজসহ আধুনিক যাত্রীসেবা সুবিধা রয়েছে। টার্মিনাল সম্প্রসারণের ফলে বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী পরিচালন সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে বেবিচক রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৯ হাজার ফুট থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করেছে।
বর্ধিত রানওয়েটি বর্তমানে দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে। এটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ চলাচল এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
সরকার আশা করছে, মালয়েশিয়া, নেপাল, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সম্ভাব্য গন্তব্যগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে হোটেল ও রিসোর্টে বিনিয়োগ বাড়বে এবং পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগও সম্প্রসারিত হবে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি মো. রাফেউজ্জামান বাসস'কে বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের প্রবেশদ্বার হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের কার্যক্রম, যৌক্তিক বিমানবন্দর ফি এবং পর্যটন গন্তব্যের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকে সামনে রেখে সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এয়ারলাইন্সগুলোর আগ্রহকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে রূপ দেওয়া।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.