ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে সিরিজ খেলে ভিরেন্দার সেওয়াগের ছেলে আরিয়াভির সেহওয়াগ শোনালেন তার ক্রিকেট দর্শন ও বাবার পরামর্শের গল্প।
বাবাকে নিয়ে গর্বই করেন আরিয়াভির সেহওয়াগ। ছবি: স্পোর্টস্টার।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
আগ্রাসী মানসিকতা আর বাউন্ডারি মারার প্রবণতা দিয়ে এমনিতেই নজর কাড়ার মতো ব্যাটসম্যান আরিয়াভির সেহওয়াগ। তবে নামের শেষে যখন আছে ‘সেহওয়াগ’, তখন তাকে ঘিরে কৌতূহল তো এক লহমায় স্পর্শ করে আকাশ। ভারতের কিংবদন্তি, আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ক্রিকেট ইতিহাসের সেরাদের একজন ভিরেন্দার সেহওয়াগের ছেলে বলে কথা!
সেই কৌতূহল আর আগ্রহের সঙ্গে আরও একটি ব্যাপার চলে আসে প্রবলভাবেই। সেটির নাম ‘চাপ।’ বিখ্যাত বাবার সন্তান হওয়াটা অনেক সময়ই বড় বোঝা। সেই চাপে নুইয়ে পড়ার নজির ক্রিকেট ইতিহাসে আছে অসংখ্য। সেওয়াগের ছেলের ক্ষেত্রে কেমন হবে, তা বলবে সময়। তবে আরিয়াভিরের দর্শনটা পরিষ্কার। তার কাছে এটি চাপ নয়, বরং গর্ব আর প্রেরণা।
ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে মাত্রই অস্ট্রেলিয়া অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে একদিনের ম্যাচের সিরিজে খেললেন আরিয়াভির। তার ব্যাটিংয়ে বাবার ছাপ ছিল স্পষ্ট। বাবার মতো তিনিও ওপেনার। বড় ইনিংস খেলতে পারেননি কোনো ম্যাচে। তবে ঝলক ঠিকই দেখিয়েছিলেন। রাজকোটে প্রথম ম্যাচে করে ৫ বাউন্ডারিতে ২৬ বলে ২৮। পরের ম্যাচে ৯টি চারে ৪৮ বলে ৪৭ করে রান আউট হয়ে যান। শেষ ম্যাচে বুধবার ৫টি চারে ৩১ বলে ৩৪ করে আউট হন।
সিরিজ শেষে স্পোর্টস্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ১৮ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান বললেন, বড় ইনিংস খেলার সুযোগ হারিয়ে তিনি হতাশ। তবেএই হতাশা তাকে অনেক কিছু শেখার সুযোগও করে দিয়েছে।
“ভালো শুরু করেও তিন ম্যাচের কোনোটিতেই বড় ইনিংস গড়তে পারিনি। শেষ ম্যাচে ভালো শুরুর পর ছক্কা মারতে গিয়ে আউট হয়ে যাই। বেশ হতাশ হয়েছি বলতে পারেন।
তবে আমি শিখেছি যে বড় রান করতে চাইলে খেলাকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে লম্বা ইনিংস খেলতে হয়। ক্রিকেট মহলে নাম করতে ও সম্মান অর্জন করতে চাইলে বড় রান করা জরুরি।”
এখানে তার বাবার সঙ্গে মিল দৃশ্যমান। ক্যারিয়ারের শুরুতে আগ্রাসনের চেষ্টায় ভিরেন্দার সেহওয়াগের অনেক সম্ভাবনাময় ইনিংস থেমে গেঝে অল্পতে। বড় শটের চেষ্টায় আউট হয়েছেন অনেকবার। তবে নিজের খেলার ধরন অটুট রেখেই বড় ইনিংস গড়তে শিখেছে। টেস্টে দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরিসহ বড় ইনিংস খেলেছেন, ওয়ানডেতেও করেছেন রাজত্ব।
কোচ রাজু শার্মার সঙ্গে দুই ভাই ভেদান্ত সেহওয়াগ ও আরিয়াভির সেহওয়াগ।
বাবার সঙ্গে সেই তুলনা অবধারিতভাবেই চলে আসছে। সঙ্গে বয়ে আসছে প্রত্যাশার ভারও। তবে আরিয়াভির স্পষ্ট করে দিলেন তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি।
“আমি আমার পদবি এবং বাবার কৃতিত্ব নিয়ে অনেক গর্বিত। বাবার নামের কারণে আমি কোনো চাপ বা বোঝা অনুভব করি না। তিনি ভারতের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি দারুণ গর্বিত।”
যদিও এসব বলা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন। সময় যত গড়াবে, তার সঙ্গে তার বাবার নাম জড়াবে আরও বেশি করে। প্রশংসা বা সমালোচনা, দুটিই তার ক্ষেত্রে হবে অনেক বেশি। তবে আরিয়াভির দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, বাইরের আলোচনায় নিজের মনোযোগ নষ্ট করতে দেবেন না তিনি।
“আমি এমন একটি মানসিকতা তৈরি করার চেষ্টা করছি, যেখানে নিজেকে বলি যে, মানুষের মন্তব্যগুলো কেবলই তাদের মতামত এবং তা আমাকে খুব বেশি প্রভাবিত করে না, তা ভালো হোক বা খারাপ, তারা আমার প্রশংসা করুক বা সমালোচনা করুক।”
অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটিতে ছেলের খেলা দেখতে মাঠে ছিলেন সেহওয়াগ। আরিয়াভির অবশ্য তা জেনেছেন পরে।
“ড্রেসিং রুমে ফেরার পর টিম ম্যানেজার আমাকে বললেন যে, বাবা গ্যালারি থেকে আমার ব্যাটিং দেখছিলেন।”
বাবার সঙ্গে অবশ্য দেখা হয়নি তার। পরে সেদিন সন্ধ্যায় কথা বলেছেন ফোনে।
“তিনি (সেহওয়াগ) আমাকে শুধু বলেছেন, যতটা সম্ভব স্বাধীনভাবে খেলতে, কোনো কিছু নিয়ে না ভাবতে এবং শুধু নিজের খেলাটা খেলতে।”
নিজের ব্যাটিং দর্শন ছেলের মধ্যেও গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করছেন সেহওয়াগ।
“বাবা আমাকে সবসময় বলেন যে ব্যাটিং খুব সহজ-স্বাভাবিক রাখা উচিত; ‘যদি এমন কোনো বল থাকে যা তুমি মারতে পারো, তবে মারো। যদি ছেড়ে দিতে পারো, তবে ছেড়ে দাও। আর যদি ডিফেন্ড করতে হয়, তবে ডিফেন্ড করো।
ব্যাটিং কৌশলের চেয়ে বাবা আমাকে মানসিক দিকের ওপর বেশি মনোযোগ দিতে বলেন, কারণ সামাজিক মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই অনেক কথা বলা হয়।”
ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে আরিয়াভিরের অভিষেক হতে পারত আগেই। তবে গত জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে যে পারেননি চোটের কারণে।
দিল্লিতে বাবার গড়া ‘সেহওয়াগ ক্রিকেট একাডেমি’ থেকেই উঠে এসেছেন আরিয়াভির। তার দুই বছরের ছোট ভাই ভেদান্ত সেহওয়াগও এই একাডেমিতেই শাণিত করছেন নিজেকে। দুই ভাইয়েরই কোচ রাজু শার্মা, যা কাছে তারা ছেলেবেলা থেকেই অনুশীলন করছেন।
বাবা অনেক বিখ্যাত হলেও আরিয়াভিরের আদর্শ ও নায়ক ভিরাট কোহলি। তাকেই তিনি প্রেরণা হিসেবে মানেন।
“আমি তার (কোহলির) অনেক বড় ভক্ত। তার সঙ্গে দেখা হঢেছে ২-৩ বার। দারুণঅভিজ্ঞতা ছিল।”
কোহলির সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে আরিয়াভির ঠিক করে রেখেছিলেন, অনেক প্রশ্ন করবেন, অনেক কথা বলবেন। কিন্তু দেখা হওয়ার পর তিনি সব ভুলে যান।
“যখন আসলে সেখানে পৌঁছালাম, তাকে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। আমার ভেতরটা একবারে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল যেন…।”
ভারতের আরেক কিংবদন্তি রাহুল দ্রাবিড়ের ছেলে আনভায় দ্রাবিড়ও খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে সিরিজটিতে। ১৭ বছর বয়সী কিপার-ব্যাটার প্রথম ম্যাচে ছয় নম্বরে নেমে করেন ১৮ বলে ৩৮। পরের ম্যাচে শেষ দিকে নেমে আউট হন ৯ বলে ৮ রানে। শেষ ম্যাচটিতে তিনি ছিলেন না।
গত জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কা সফরেও ছিলে আনভায়। সেখানে একটি ম্যাচে খেলেছিলেন ৬৭ বলে ৮৭ রানের ইনিংস।