অন্ধকার হলে বসে রুপালি পর্দায় চোখ রেখে পপকর্নে কামড় দেওয়া—এই অভ্যাস বিশ্বজুড়ে এক চিরচেনা বিনোদন। এখন অবশ্য পপকর্ন কালচার ঢুকে পড়েছে একেবারে ঘরের মধ্যে বড় স্ক্রিনে ওটিটিতে প্রিয় মুভি বা সিরিজ দেখার মাধ্যমে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এক মুঠো কুড়মুড়ে স্ন্যাকসের ইতিহাস কতটা প্রাচীন হতে পারে কিংবা কীভাবে এটি সারা পৃথিবীর মানুষের পছন্দের শীর্ষে পৌঁছাল? আজকের দিনে আপনার ঘরে এয়ার পপার মেশিন দিয়ে মাত্র ৩ মিনিটের কম সময়ে ১০ কাপ পপকর্ন বানানো সম্ভব। এমনকি ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির তৈরি রোবটও এখন পপকর্ন পরিবেশন করতে পারে। কিন্তু এই পপকর্ন সত্যি এক অবিশ্বাস্য যাত্রাপথ পাড়ি দিয়ে আজও আমাদের সঙ্গে রয়েছে।
পপকর্নকে আমরা আধুনিক স্ন্যাকস মনে করলেও এটি পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন খাবার। ২০১২ সালে পেরুর উত্তরাংশের প্যারেডোনেস এবং হুয়াকা প্রিয়েটা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পাওয়া প্রাচীন ভুট্টার ছড়া, শিষ ও কাণ্ড পরীক্ষা করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা জানান, আজ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ বছর আগেই মানুষ ভুট্টা ভেজে খেত। তবে আজকের চেনা পপকর্নের প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৭৬ সালে ফিলাডেলফিয়ার সেন্টেনিয়াল এক্সপোজিশনে (যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বিশ্ব প্রদর্শনী) পপকর্ন বিক্রেতাদের দেখা মিলত, যাঁরা থ্যাংকস গিভিংয়ের জন্য চুলার ওপর হাত দিয়ে পপকর্ন ফোটাতেন।
১৮৯০ সালে শিকাগোর উদ্যোক্তা চার্লস ক্রিটর্স পপকর্ন ফোটানোর প্রথম যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ১৯১২ সালের দিকে আমেরিকায় বাষ্পচালিত মেশিনের মাধ্যমে রাস্তায় রাস্তায় পপকর্ন ও বাদাম বিক্রি শুরু হয়। পরে ১৮৯৬ সালে ক্যানডির দোকানে ক্র্যাকার জ্যাক নামের পপকর্ন ও বাদামের স্ন্যাকস বিক্রি শুরু হয়। এটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে বেসবল খেলার সঙ্গে বোনাস হিসেবে খেলোয়াড়দের কার্ড দেওয়ার কারণে। অন্যদিকে অর্ভিল রেডেনবাচার নামের এক ব্যক্তি প্রায় ৪০ বছর ধরে ৩০ হাজার পপকর্ন হাইব্রিড ক্রসব্রিডিং করে পারফেক্ট কার্নেল তৈরি করে পপকর্ন শিল্পে বিপ্লব আনেন।
অনেক সময় ভুট্টা কিনে এনে বাড়িতে আমরা পপকর্ন বানানোর চেষ্টা করি। এতে অনেক সময় সফল হলেও বেশির ভাগ সময় ভালো পপকর্ন তৈরি হয় না। কারণ, সব ভুট্টায় পপকর্ন হয় না। এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ। পপকর্ন হলো এক বিশেষ জাতের ভুট্টা। এর শক্ত খোসা বা পেরিকার্পের ভেতরে সামান্য পানি থাকে। তাপে সেই পানি বাষ্পে পরিণত হয়ে চাপ সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে সশব্দে ফেটে ভেতরের শ্বেতসার তুলতুলে কুড়মুড়ে আকারে বাইরে বেরিয়ে আসে। এই কুড়মুড়ে স্বাদই আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের আনন্দের অনুভূতি তৈরি করে।
বর্তমানে বাড়িতে বসে কিংবা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সময় হাতের কাছে পপকর্ন থাকতেই হবে, এটা অঘোষিত নিয়ম হয়ে গেছে। কিন্তু পপকর্নের সঙ্গে সিনেমার সম্পর্ক শুরুতে বেশ জটিল ছিল। প্রথমে সিনেমা হলের মালিকেরা পপকর্ন খেতে বাধা দিতেন। কারণ, নীরব সিনেমার যুগে শব্দ করে পপকর্ন খাওয়া নাকি দর্শকদের মনোযোগ নষ্ট করত। তবে ত্রিশের দশকের মহামন্দার সময় চিত্রটা বদলে যায়। চরম অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও সস্তা স্ন্যাকস হিসেবে পপকর্নের ব্যবসা জমে ওঠে। পরে থিয়েটার মালিকেরা লাভের বাণিজ্যিক সুযোগ বুঝতে পেরে হলের ভেতরেই পপকর্ন ভেন্ডিং মেশিন বসানো শুরু করেন।
পপকর্নের জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে আকাশ ছুঁয়েছে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্ট্যাটিস্টা, পপ আইকন