ডাকসু সংগ্রহশালায় ছবি সরানোর বিতর্ক কি ইতিহাসকে নিরপেক্ষ করার প্রয়াস, নাকি এক স্মৃতির জায়গায় আরেক স্মৃতি বসানোর রাজনীতি?
ডাকসু সংগ্রহশালায় স্থান পাওয়া জিন্নাহর সেই তিনটি ছবি; এগুলোকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে পাল্টাপাল্টি প্রতিবাদ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ছবি: আরফাতুল ইসলাম নাইম
ডাকসু সংগ্রহশালাকে ঘিরে গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে কয়েকটি ছবি নিয়ে বিরোধ। প্রথমে নতুন করে সাজানো সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্বের শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উপস্থিতির অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠল। এরপর জিন্নাহর ছবি ছেঁড়া হলো। পরে সেখানে গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটানো হলো। আবার সেই ছবি এবং জিন্নাহর ছবি মেঝেতে রেখে পদদলিত করে প্রতিবাদও হলো।
ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে পড়া যায়, কিন্তু তাতে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বাদ পড়ে যাবে। কারণ এই বিরোধের কেন্দ্রে আসলে কোনো একটি ছবি নেই; এটি ইতিহাসের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিরোধ। প্রশ্ন হচ্ছে, অতীতের কোন অংশকে প্রতিষ্ঠান স্বীকৃতি দেবে, কোন অংশকে প্রান্তে রাখবে এবং সেই নির্বাচনের বৈধতা নির্ধারণ করবে কে।
এই জায়গা থেকেই ডাকসু সংগ্রহশালার বিতর্কটি বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বিন্যাসে জিন্নাহর তিনটি ছবি রয়েছে। অথচ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা, আগরতলা মামলা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন কিংবা ৭ মার্চের সঙ্গে সম্পর্কিত উল্লেখযোগ্য ছবি নেই। বিপরীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্বে তাঁকে ঘিরে সমালোচনামূলক সংবাদের কাটিং, দুর্ভিক্ষের ছবি এবং পারিবারিক ছবি রাখা হয়েছে। কেন আগের পর্বে মুজিবের ছবি নেই, জানতে চাইলে ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলনবিষয়ক সম্পাদকের উত্তর ছিল, “ইচ্ছা হয়নি, তাই রাখিনি।”
আমার কাছে পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল সম্ভবত এই ছোট বাক্যটিই।
ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি নামিয়ে দেওয়ার পর প্রতিবাদে সেই স্থানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি টাঙিয়ে দেয় একটি ছাত্র ফেডারেশন।
কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় কী থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত কখনোই পুরোপুরি নিরপেক্ষ নয়। প্রতিটি সংগ্রহশালাই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। জায়গা সীমিত, দলিল অসংখ্য; ফলে কিছু রাখতে হয়, কিছু বাদ দিতে হয়। কিন্তু নির্বাচন আর খেয়ালের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। নির্বাচন ব্যাখ্যা করা যায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব, কালক্রম, দলিল, প্রেক্ষাপট এবং প্রতিনিধিত্বের নীতির মাধ্যমে। ‘ইচ্ছা হয়নি’—সেই ব্যাখ্যার জায়গায় ব্যক্তিগত পছন্দ ও রাজনৈতিক বিশ্বাসকে বসিয়ে দেয়।
এখানেই সংগ্রহশালা থেকে প্রশ্নটি ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশ করে।
ইতিহাসের বয়ান শুধু উপস্থিতির মাধ্যমে তৈরি হয় না, অনুপস্থিতিও বয়ান তৈরি করে। কোনো ব্যক্তিকে রাখা হলো সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার জীবনের কোন সময়টিকে রাখা হলো সেটিও তেমন গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ মুছে না দিয়েও তার রাজনৈতিক জীবনের এমন অংশগুলো নির্বাচন করা সম্ভব, যাতে দর্শক একটি পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
ডাকসুর বর্তমান বিন্যাস নিয়ে তাই প্রশ্নটি ‘মুজিব আছেন কি নেই’—তা নয়; বরং কোন মুজিবকে দেখানো হচ্ছে?
১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মুজিবের কর্তৃত্ববাদী শাসন দৃশ্যমান। সেটি অবশ্যই ইতিহাসের অংশ এবং থাকা উচিত। কিন্তু ১৯৬৬ সালের ছয় দফার মুজিব নেই; আগরতলা মামলার প্রধান আসামি নেই; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক কেন্দ্রের একজন প্রধান চরিত্র নেই; ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দলের নেতা নেই; ৭ই মার্চের বক্তাও নেই।
এই নির্বাচন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পাঠ তৈরি করে। জীবনীটি মুছে ফেলা হয়নি; জীবনীটির রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া হয়েছে।
এখানেই জিন্নাহর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জিন্নাহকে সরিয়ে দেওয়ার যুক্তি হিসেবে নয়।
১৯৪৮ সালে ঢাকার রেসকোর্সে জিন্নাহর ভাষানীতি ঘোষণার ছবি অবশ্যই থাকা উচিত। কারণ পাকিস্তানি রাষ্ট্রের ভাষানীতি এবং তার বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার প্রতিরোধ বোঝাতে সেই মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি ব্যাখ্যা হয় যে সেখানে জিন্নাহকে নয়, একটি ঘটনাকে দেখানো হয়েছে, তাহলে একই নীতি অন্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে হবে।
ছয় দফা কি ঘটনা নয়? আগরতলা মামলা কি ঘটনা নয়? ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কি ঘটনা নয়? ১৯৭০ সালের নির্বাচন কি ঘটনা নয়? ৭ই মার্চ কি ঘটনা নয়?
এখানে প্রশ্নটি মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধা বা বিরাগের নয়। প্রশ্নটি একই সংগ্রহশালার ভেতরে একই ঐতিহাসিক মানদণ্ড সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না।
কারণ ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবের রাজনৈতিক কেন্দ্রীয়তা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের তৈরি কোনো স্মৃতি নয়। ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সংকটের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। আগরতলা মামলা এবং তার মুক্তির দাবি ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। সেই আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এবং ছাত্রনেতৃত্বের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭০ সালের নির্বাচন আরও সরাসরি দলিল দেয়। শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনসহ ১৬৭টি অর্জন করে এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। এই ফল বাদ দিয়ে যেমন ১৯৭০ বোঝা যায় না, তেমনি সেই ফলের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অদৃশ্য রেখেও নির্বাচনের তাৎপর্য পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
৭ই মার্চের ভাষণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ভাষণটি ইউনেসকোর বিশ্বস্মৃতি নিবন্ধনের অংশ। অতএব এখানে মুজিবকে দৃশ্যমান করা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের দাবি নয়; এটি সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক ঘটনার যথাযথ প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।
একই সঙ্গে এর বিপরীত সত্যটিও স্বীকার করা প্রয়োজন। স্বাধীনতার পর মুজিবের কর্তৃত্ববাদী শাসনও ইতিহাসের অংশ; সেটি বাদ দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এখানেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা রাজনৈতিক প্রচারপত্র থেকে আলাদা হতে পারে। একই ব্যক্তির মুক্তিসংগ্রামে ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং পরবর্তী কর্তৃত্ববাদী শাসনকে পাশাপাশি দেখানোর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাই পরিণত ইতিহাসচর্চার পরীক্ষা।
ইতিহাসের অসুবিধা হলো, সে রাজনৈতিক আনুগত্যের মতো পরিচ্ছন্ন নয়। একই মানুষ একই সঙ্গে ইতিহাসের এক অধ্যায়ে মুক্তির রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র এবং অন্য অধ্যায়ে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূতকারী শাসক হতে পারেন। একটি সত্য স্বীকার করতে আরেকটি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন আমরা ইতিহাসকে নৈতিকভাবে সুবিধাজনক চরিত্রে ভাগ করতে চাই।
এই কারণেই পরবর্তী ঘটনাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্কের পর অন্য শিক্ষার্থীরা গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ঐতিহাসিক ছবি একই দেয়ালে সাঁটিয়ে দেন। ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে সংগ্রহশালার মেঝেতে জিন্নাহ ও যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের ছবি সাঁটিয়ে পদদলিত করেন একদল শিক্ষার্থী। এটিকে আমি ইতিহাসচর্চার আদর্শ পদ্ধতি বলছি না; কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা পাল্টাপাল্টি ছবি টাঙানোর মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে না। অন্য কারোর ছবি পদদলনও
ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার প্রতিবাদে মেঝেতে জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি সাঁটিয়ে পদদলন করছেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
কিন্তু ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সত্য প্রকাশ করেছে—প্রাতিষ্ঠানিক নির্বাচন যখন রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, তার বিরুদ্ধে পাল্টা স্মৃতিও রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়।
অর্থাৎ আপনি যদি ইতিহাসের দেয়ালকে একটি রাজনৈতিক বক্তব্যের বাহন বানান, অন্য পক্ষও সেই দেয়ালকে বক্তব্য দেওয়ার জায়গা হিসেবে দাবি করবে। তখন সংগ্রহশালা আর শুধু সংগ্রহশালা থাকে না; সেটি পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী স্মৃতির ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক স্মৃতি নিয়ে গবেষণার একটি মৌলিক উপলব্ধি এখানেই: ক্ষমতা শুধু মানুষকে কী মনে রাখতে হবে তা নির্ধারণের চেষ্টা করে না, কী ভুলে যেতে হবে সেটিও নির্ধারণ করতে চায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিস্মৃতি প্রায়ই পাল্টা স্মৃতি সৃষ্টি করে। যে ইতিহাসকে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়, সেটিই কখনো নতুন রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে ফিরে আসে।
একসময় রাষ্ট্রীয়ভাবে শেখ মুজিবের উপস্থিতিকে এমন মাত্রায় বিস্তৃত করা হয়েছিল যে ইতিহাস ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় স্মৃতির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই অতিরিক্ত উপস্থিতির সংশোধন যদি নির্বাচিত অনুপস্থিতিতে পরিণত হয়, তাহলে আমরা ইতিহাসকে মুক্ত করছি না; আমরা শুধু এক ধরনের স্মৃতি-রাজনীতির জায়গায় আরেক ধরনের স্মৃতি-রাজনীতি বসাচ্ছি।
একটি বিকৃতির প্রতিষেধক আরেকটি বিকৃতি হতে পারে না।