দুই বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আকাশপথে যাত্রী চলাচল প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৩ সালে ৬৪ লাখ ৫০ হাজার যাত্রী থাকলেও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখে।
দেশি-বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো ও নতুন রুট চালু করায় চলতি বছরও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বাড়া, ধর্মীয় আচার পালন এবং চিকিৎসা ও পর্যটনের মতো প্রয়োজনে বিদেশ ভ্রমণের চাহিদা বেড়ে যাওয়াকে যাত্রী বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই বাড়তি যাত্রীর বেশির ভাগের যাত্রা শুরু বা শেষ হচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু যাত্রী বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধা।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে ধীরগতিতে। তাই বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো বাড়তি যাত্রীর চাহিদা মেটানোর সুযোগ পাচ্ছে।
চাহিদার সঙ্গে সক্ষমতার এই ব্যবধানের প্রভাব পড়ছে দুইভাবে। একদিকে, বিমানবন্দরে ভিড় বাড়লেও যাত্রীরা প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, বাজারের বাড়তি চাহিদা কাজে লাগানোর সুযোগ হারাচ্ছে দেশি এয়ারলাইনসগুলো।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করা আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা ছিল ৭৯ লাখ।
দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘চলতি বছর এখন পর্যন্ত আমরা যাত্রী চলাচল বেশ ভালো দেখেছি।’
২০১৯ সালে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো, বিশেষ করে ঢাকার বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেছেন।
এর পরের বছর কোভিড-১৯ মহামারি ঠেকাতে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে বিধিনিষেধ আরোপ করলে যাত্রীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৫ লাখ ৪০ হাজারে। পরবর্তী বছরগুলোতে বিধিনিষেধ শিথিল হয়, বিমান সংস্থাগুলোও আবার ফ্লাইট চালু করে। তাতে যাত্রী চলাচল ঘুরে দাঁড়ায়।
কামরুল ইসলাম বলেন, ‘কোভিড-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ফলে যাত্রী চলাচল বেড়েছে। পাশাপাশি বিমান সংস্থাগুলো নতুন রুট চালু করেছে এবং ফ্লাইটের সংখ্যাও বাড়িয়েছে।’
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের চারটি দেশি বিমান সংস্থার পাশাপাশি ৩৪টি বিদেশি বিমান সংস্থা ১৭টি দেশের ২৫টি গন্তব্যে যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করে।
আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার (আইএটিএ) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্য। বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এ অঞ্চলে কাজ করেন। এরপর রয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপ।
আইএটিএর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক রুট ছিল জেদ্দা, কুয়ালালামপুর ও রিয়াদ। এরপরের অবস্থানে ছিল দুবাই, মাসকাট, দোহা, দাম্মাম, কলকাতা, শারজাহ ও লন্ডন।
বিমান চলাচল খাত দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতে সরাসরি প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
খাতটির অর্থনৈতিক উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২৪০ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির শুণ্য দশমিক ছয় শতাংশ। উড়োজাহাজ চলাচলের পাশাপাশি এ খাতের ওপর নির্ভরশীল পর্যটন থেকে ৫৩০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে, যা জিডিপির এক দশমিক দুই শতাংশের সমান।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট অপারেশন্স বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন একেএম আমিনুল ইসলামও আন্তর্জাতিক যাত্রী বৃদ্ধির পেছনে বিদেশে কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি, তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিমানভ্রমণ এবং ওমরাহ পালনের চাহিদাকে কারণ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আরও বেশি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে এবং বিমানভ্রমণ এখন আর আগের মতো ব্যয়বহুল নয়।’
বেবিচকের সদস্য (এয়ার ট্রাফিক) এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলমের মতে, আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের এই বৃদ্ধি পুরো অঞ্চলের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘যাত্রী চলাচল হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কোনো কারণ চিহ্নিত করা কঠিন। পুরো অঞ্চলেই যাত্রী চলাচল বাড়ছে এবং বাংলাদেশেও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।’
ক্যাপ্টেন আমিনুল বলেন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণের চাহিদা বাড়ায় বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হচ্ছে। এর একটি কারণ হলো, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ দেশের অন্যান্য বিমান সংস্থার উড়োজাহাজের সংখ্যা সীমিত।
জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটের চাহিদা এত বেশি যে অনেক সময় যাত্রীরা সরাসরি ফ্লাইটের টিকিট পান না। তখন ফ্লাইনাস ও জাজিরা এয়ারওয়েজের মতো সংস্থার সংযোগকারী ফ্লাইট বেছে নিতে হয়, বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছাতে বিকল্প সংযোগকারী ফ্লাইট খুঁজছেন।’
ক্যাপ্টেন আমিনুল বলেন, ‘আমাদের বহরে আরও উড়োজাহাজ যুক্ত করতে করতে আরও পাঁচ বছর লেগে যেতে পারে। তত দিনে অন্য বিমান সংস্থাগুলো হয়তো বাজারের বড় অংশ দখল করে ফেলবে।’
এদিকে এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফ্লাইট পরিচালনাকারী বিদেশি সংস্থাগুলোর মধ্যে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইনস ও এমিরেটসের নাম উল্লেখ করেছেন।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর বেশির ভাগই বোয়িংয়ের জেট উড়োজাহাজ ও ড্যাশ ৮ টার্বোপ্রপ। বহরে আরও ৩৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। এর মধ্যে ২৫টি যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং এবং ১০টি ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের কাছ থেকে কেনার কথা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হবে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে। এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরুর কথা ২০৩৩ সালে।
এর আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, বিমানকে সহায়তা করতে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই উড়োজাহাজ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। দেশের মোট বিমানযাত্রীর ২০ শতাংশের সামান্য বেশি পরিবহন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
বাংলাদেশে আটটি বিমানবন্দর রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীদের আসা-যাওয়া হয়।
তবে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের বেশির ভাগই ঢাকার বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে নথিভুক্ত ৭৯ লাখ আন্তর্জাতিক যাত্রীর ৯২ শতাংশই এ বিমানবন্দর দিয়ে যাতায়াত করেছেন।