বিদ্যমান গ্যাস সংকট কাটিয়ে উঠতে এবং দেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ২ বছরের লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করে গেলেও আপাতত শিল্পখাতকে খানিকটা চাপের মধ্য দিয়েই যেতে হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
আজ সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) আয়োজিত 'বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি' শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, 'আমরা কাল বা পরশুই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলব—এমন কথা বলে জনগণকে ভুল আশা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। আমাদের অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দুই বছরের মধ্যে জ্বালানি খাতসহ পুরো অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে অর্থনীতি গতি নেবে এবং চতুর্থ ও পঞ্চম বছরে গিয়ে অর্থনীতি পূর্ণমাত্রায় ঘুরে দাঁড়াবে। এর চেয়ে ভালো বা চটজলদি কোনো আশা দেওয়াটা ভুল হবে, আর আমি তা করতে চাই না।'
অর্থমন্ত্রী জানান, জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৭০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। বৈশ্বিক সংকট চরম আকার ধারণ করায় অতিরিক্ত এই ব্যয়ের মাত্রা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা এখনো অনিশ্চিত। এই আন্তর্জাতিক সংকট বাংলাদেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে শিল্পমালিক ও উৎপাদকরা অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছেন।
গ্যাস সরবরাহ দ্রুত বাড়াতে সরকারের নানা পরিকল্পনা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, দেশে ৩ থেকে ৪টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে—যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া, চীন এবং আমেরিকার বিনিয়োগকারীরা অর্থায়নে আগ্রহী। তবে এ জাতীয় টার্মিনাল ও অবকাঠামো তৈরি হতে অন্তত ১৮ মাসের মতো সময় লাগে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি আমেরিকান, দক্ষিণ কোরীয় ও ইতালীয় অভিজ্ঞ বেশ কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে উপকূলভিত্তিক (শোর-বেসড) এলএনজি টার্মিনাল নিয়েও আলোচনা চালাচ্ছে সরকার।
বড় আকারের এলএনজি ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলের সুবিধার্থে এবং শিপিং খরচ কমিয়ে আনতে গভীর সমুদ্রবেষ্টিত মাতারবাড়ী এবং খুলনার নিকটবর্তী অপর একটি অঞ্চলকে (যেখানে পানির গভীরতা প্রায় ২০ মিটার) মূল জ্বালানি হাব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জানান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এবং আন্তর্জাতিক প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি)-এর মাধ্যমে স্থলভাগ ও সমুদ্রে নতুন কূপ খননের জোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাপেক্সের মাধ্যমে ১৫০টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, যার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের প্রস্তাবও ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে।
জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সরকার সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য শক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং ছাদে সোলার প্যানেল বসানোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে সারাদেশে প্রায় ১০ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সাথে সাধারণ বাসাবাড়ির গ্রাহকরা যাতে তাদের ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ মূল জাতীয় গ্রিডে আকর্ষণীয় দামে বিক্রি করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে বলে মন্ত্রী জানান।
গ্যাস সংকটের কারণে বর্তমানে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় (কস্ট অব ডুইং বিজনেস) বাড়ছে তা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতি রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়।
আগামী জুনের মধ্যে একটি 'পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা' শেষ হবে, আর পরবর্তী আড়াই বছরের মধ্যে প্রধান প্রধান মূল অবকাঠামো দাঁড় করানোর কাজ সম্পন্ন করা হবে বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আর্থিকখাতের দুর্বলতা, পুঁজিবাজারের অস্থিরতা এবং জিডিপির তুলনায় নিম্ন রাজস্ব আদায়কে মূল উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তিনি বলেন, সরকার বর্তমানে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে, নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং রাজস্ব নীতি নির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আলাদা করে এনবিআর ও পুরো কর প্রশাসনে সংস্কার আনতে কাজ করছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে, বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ অব্যাহত সমর্থন পাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলছে।
তবে চূড়ান্ত সংস্কার কার্যক্রম এবং জ্বালানি অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ফল মিলতে কিছুটা সময় লাগবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী দেশের ব্যবসায়ী সমাজকে আগামী কিছুদিন কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শু শিয়ং, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ এবং বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক।
এ ছাড়া এফআইসিসিআইয়ের প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.