আমরা সবাই সুখী হতে চাই। কেউ ভাবেন, জীবনের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেই শান্তি মিলবে। কেউ অপেক্ষা করেন মনের মতো একজন মানুষের। আবার কেউ মনে করেন, আরও একটু টাকা, ভালো চাকরি কিংবা বড় বাড়ি পেলেই জীবন পূর্ণ হবে।
কিন্তু যে বিশ্বাসগুলোকে আমরা সুখের চাবিকাঠি মনে করি, সেগুলোই কখনো কখনো আমাদের অসুখী করে তোলে। দার্শনিকদের মতে, নিজেদের এমন পাঁচটি ধারণা নিয়ে নতুন করে ভাবা দরকার। কারণ, সুখের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমাদের নিজেদেরই কিছু বিশ্বাস। কারণ এসব ধারণা আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত ও জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে।
দর্শন আমাদের এসব বিশ্বাস যাচাই করতে শেখায়। কোনটি কাজে লাগে, আর কোনটি অকারণে কষ্ট বাড়ায়, তা বুঝতে সাহায্য করে। এমন পাঁচটি ধারণা নিয়ে ভাবা যাক, যেগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে জীবনকে সহজভাবে দেখা সম্ভব।
জীবনের সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। অতীত বদলানো যায় না, বয়স বাড়া থামানো যায় না। অন্য মানুষ আমাদের সম্পর্কে কী ভাববেন, সেটাও পুরোপুরি আমাদের হাতে নেই।
তারপরও আমরা অনেক সময় এমন বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করি, যা বদলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। এতে সময় ও মানসিক শক্তি দুটোই নষ্ট হয়।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এপিকটিটাসের স্টোয়িক দর্শন বলে, নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আর যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা মেনে নিতে শেখা প্রয়োজন।
বৌদ্ধ দর্শন ও তাওবাদেও একই ধরনের ভাবনা পাওয়া যায়। সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো করার চেষ্টা না করে কোথায় চেষ্টা করতে হবে আর কোথায় পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে, তা বুঝতে শেখাই গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকের ধারণা, জীবনে একজন বিশেষ মানুষ আসবেন, যিনি তাদের সব অপূর্ণতা দূর করে দেবেন। তাকে পেলেই জীবন হয়ে উঠবে পরিপূর্ণ।
ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ারের মতে, নিজের সুখের জন্য অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়া বিপজ্জনক। এতে নিজের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিসত্তা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
ভালোবাসার সম্পর্কে সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা জরুরি। কিন্তু তাই বলে নিজের ইচ্ছা, পরিচয় ও স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়।
জীবনে ভালোবাসার মানুষ থাকা আনন্দের। তবে নিজের সুখের পুরো দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া ঠিক নয়।
অনেকেই মনে করেন, তাদের স্বভাব ও চিন্তাভাবনা সব সময় একই থাকবে। কিন্তু মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলায়। নতুন অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও সম্পর্ক আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিতে পারে।
দার্শনিক ডেভিড হিউম মানুষের স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় সত্তার ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার মতে, নিজেদের পর্যবেক্ষণ করলে আমরা চিন্তা, অনুভূতি ও স্মৃতির মতো নানা অভিজ্ঞতা খুঁজে পাই। এসব অভিজ্ঞতা প্রতিনিয়ত বদলায়।
এ থেকে একটি বিষয় শেখা যায়, অতীতে ভুল করেছি বলে ভবিষ্যতেও একই ভুল করতে হবে, এমন নয়। মানুষ নিজের ভুল থেকে শিখতে পারে, বদলাতে পারে। তাই নিজেকে পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া জরুরি।
আমরা অনেক সময় মনে করি, পরিশ্রম করেছি, তাই সফল হতেই হবে। অন্যের জন্য ভালো কিছু করেছি, তাই তার কাছ থেকেও ভালো ব্যবহার পাওয়া উচিত।
কিন্তু জীবন সব সময় আমাদের প্রত্যাশামতো চলে না। চেষ্টা করেও ব্যর্থ হতে পারি। আবার প্রাপ্য বলে মনে করা কিছু জিনিসও না পেতে পারি।
ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামুর দর্শনে জীবনের অর্থ খোঁজার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই, জীবনের প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকুক। কিন্তু সব ঘটনার অর্থ বা ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
তাই সবকিছু নিজের প্রত্যাশামতো হওয়ার দাবি না করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া প্রয়োজন। যা আছে, তার মধ্যেই জীবনের অর্থ ও আনন্দ খুঁজে নিতে হবে। পরিস্থিতি যেমনই হোক, যথাসাধ্য ভালোভাবে বাঁচার চেষ্টা করাই গুরুত্বপূর্ণ।
ভালোভাবে বাঁচতে অর্থের প্রয়োজন আছে। আর্থিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনে। কিন্তু সম্পদ যত বাড়বে, সুখও তত বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্রাচীন গ্রিসের এপিকিউরীয় দার্শনিকেরা মনে করতেন, সুখী হতে হলে বর্তমান জীবন ও আশপাশের বিষয়গুলোর সঙ্গে সন্তুষ্ট থাকতে শেখা প্রয়োজন। দার্শনিক এপিকিউরাসের ভাবনা হলো, অল্পতে সন্তুষ্ট হতে না পারলে অনেক কিছু পেয়েও সন্তুষ্ট হওয়া কঠিন।
বৌদ্ধ দর্শনেও অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষাকে দুঃখের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়। একটি ইচ্ছা পূরণ হলে নতুন আরেকটি ইচ্ছা তৈরি হয়। এভাবে চাওয়ার শেষ থাকে না।
তাই অর্থ উপার্জন বা সাফল্য অর্জনের চেষ্টা করা ভুল নয়। সমস্যা হলো, ভবিষ্যতে আরও কিছু পাওয়ার আশায় বর্তমানের আনন্দকে উপেক্ষা করা। যা অর্জন করতে চাই, তার পেছনে ছুটতে গিয়ে এখন যা আছে, তার মূল্যও ভুলে যাওয়া।
সুখী হতে হলে কেবল বাইরের পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করলেই হবে না। নিজেদের চিন্তাভাবনাও বুঝতে হবে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা, অন্যের ওপর সুখের দায়িত্ব চাপানো কিংবা আরও বেশি পাওয়ার আশায় বর্তমানকে অবহেলা না করে নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।
জীবনে অর্থ, ভালোবাসা ও সাফল্য সবকিছুরই গুরুত্ব আছে। তবে এগুলোর পেছনে ছুটতে গিয়ে বর্তমানের ছোট ছোট আনন্দ হারিয়ে ফেললে সুখও অধরা থেকে যেতে পারে।