খুলনার রূপসায় ছেলে হত্যা মামলার বাদী আক্তার ঢালীকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত সোমবার মাগরিবের নামাজ শেষে আইচগাতি ইউনিয়নের দুর্জনীমহল গ্রামের একটি চায়ের দোকানে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা অস্ত্রধারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১৫ আগস্ট আক্তার ঢালীর ছেলে জয় ঢালীকে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়।
জয় ঢালী হত্যার ঘটনায় তার বাবা আক্তার ঢালী বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিহিংসাবশত শ্বশুরবাড়ির লোকজন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কিলিং মিশনে পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপের অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও স্থানীয় বিরোধ মেটাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ ব্যবহারের প্রবণতা খুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সঙ্গে জড়িত গ্রুপগুলো ছড়িয়ে পড়ছে প্রত্যন্ত এলাকায়ও।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত খুলনা মহানগরীর আট থানায় ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। একই সময় জেলার ৯ উপজেলায় হত্যার ঘটনা ঘটেছে ৩৫টি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অভিযান ও তৎপরতার খবর থাকলেও খুলনায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা কমছে না। রক্তাক্ত জনপদে বাড়ছে প্রাণহানির তালিকা।
রূপসার চাঞ্চল্যকর বাবা-ছেলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আনিসুজ্জামান জানান, স্ত্রীকে ডিভোর্স দেওয়ার বিরোধে প্রথমে জয় ঢালী ও পরে তার বাবা আক্তার ঢালীকে হত্যা করা হয়েছে।
আক্তার ঢালী হত্যায় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা পুলিশের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, খুলনা মহানগরীর অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেপ্তারের পর এসব গ্রুপের তৎপরতার চিত্র সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় নগরীর আলোচিত অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ‘বি-কোম্পানি’, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান গ্রুপ, বেজি আল-আমিন, শাকিল গ্রুপ ও নাসিম গ্রুপ।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৩ মাসে মহানগরীর আট থানায় ৯৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৯৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ২৯টি, ২০২৫ সালে ৩৭টি এবং চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরে সদর থানায় ছয়টি, লবণচরা থানায় ছয়টি এবং অন্যান্য থানায় ১৮টি মামলা হয়েছে।
কেএমপির সহকারী কমিশনার (অপরাধ) গোলাম মোহাম্মদ বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ডিবির উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, সন্ত্রাসী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তার দাবি, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদককেন্দ্রিক বিরোধের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে পুলিশ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।