আজ ৭ অক্টোবর, বিশ্ব তুলা দিবস। কৃষি, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পায়নে তুলার অবদান তুলে ধরার পাশাপাশি টেকসই তুলা উৎপাদনের গুরুত্ব স্মরণে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘সবার কল্যাণে তুলা: বাণিজ্য, রূপান্তর ও সহযোগিতার মাধ্যমে সমৃদ্ধি গড়া’।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা জানিয়েছে, তুলা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আঁশ। পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য ও বিভিন্ন শিল্পে এর ব্যবহার রয়েছে। তুলা চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাণিজ্যের সঙ্গে বিশ্বের লাখো কৃষক, শ্রমিক ও তাদের পরিবার যুক্ত। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে তুলা কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও আয়ের উৎস। এর প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২১ সালে ৭ অক্টোবরকে বিশ্ব তুলা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর আগে ২০১৯ সালে তুলা উৎপাদনকারী চার আফ্রিকান দেশ বেনিন, বুরকিনা ফাসো, চাদ ও মালির উদ্যোগে দিবসটি পালনের যাত্রা শুরু হয়।
তুলা উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশ হলো চীন, ভারত, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান। বিশ্বে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক তুলা চাষের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাণিজ্য পর্যন্ত তুলা খাতে আনুমানিক ১২ কোটি ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। বিশ্বে পলিয়েস্টারের পর তুলা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত আঁশ, যা মোট আঁশের চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।
তবে কৃত্রিম আঁশের ব্যবহার বাড়ায় গত কয়েক দশকে তুলার চাহিদার অংশ কমেছে। পাশাপাশি আবহাওয়ার পরিবর্তন, সরবরাহব্যবস্থায় বাধা, কৃত্রিম আঁশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, পরিবর্তিত নীতিমালা ও ভোক্তার পছন্দের পরিবর্তন তুলা খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞান, গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য তুলার গুরুত্ব আরও বেশি। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল তুলা। মাঠে উৎপাদিত তুলা প্রক্রিয়াজাত হয়ে সুতা, কাপড় এবং শেষ পর্যন্ত তৈরি পোশাকে রূপ নেয়। সেই পোশাক রপ্তানি হয়ে পৌঁছে যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে।
কিন্তু বিপুল পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা থাকলেও তুলা উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। দেশে বছরে তুলার চাহিদা প্রায় ৮৫ লাখ বেল। বিপরীতে ২০২৪ অর্থবছরে দেশীয় উৎপাদন হয়েছে মাত্র প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার বেল। অর্থাৎ দেশের মোট চাহিদার সামান্য অংশই স্থানীয় উৎপাদন থেকে পূরণ হয়।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২৪ মিলিয়ন কৃষক তুলা চাষের সঙ্গে যুক্ত। আর বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ তুলার প্রয়োজন হলেও উৎপাদন খুবই কম হওয়ায় প্রায় পুরো চাহিদাই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম, জাহাজভাড়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিংবা সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা দেখা দিলে দেশের সুতা, বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতেও এর প্রভাব পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিল বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান তুলা সরবরাহকারী হয়ে উঠেছে। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও তুলা আমদানি করা হচ্ছে।
দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও সীমিত আবাদযোগ্য জমির কারণে শুধু জমির পরিমাণ বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন। তাই উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, সেচ, যান্ত্রিকীকরণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কম জমিতে বেশি উৎপাদনের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তুলা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে নিশ্চিত বাজার ও ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কৃষকের মধ্যে আগাম ক্রয়চুক্তি হলে বাজারঝুঁকি কমতে পারে। পাশাপাশি তুলা উৎপাদন এলাকায় আধুনিক জিনিং, মান যাচাই, গ্রেডিং ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি করা তুলা থেকে দেশে সর্বোচ্চ মূল্য তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি, বাণিজ্য ও বস্ত্র খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, কৃষক, সুতা উৎপাদনকারী কারখানা, বস্ত্রশিল্প ও পোশাক রপ্তানিকারকদের সমন্বিত উদ্যোগে এ খাত আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
বিশ্ব তুলা দিবস তাই শুধু তুলা চাষের গুরুত্ব তুলে ধরার দিন নয়, বরং কৃষকের জীবিকা, শিল্পের কাঁচামাল, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং টেকসই অর্থনীতির সঙ্গে তুলার সম্পর্ক নতুন করে ভাবারও সুযোগ। বাংলাদেশের মতো তৈরি পোশাকনির্ভর দেশের জন্য দেশীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি তুলা থেকে আরও বেশি মূল্য সংযোজনের পথ তৈরি করা বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে।