চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৬৩ কোটি টাকা।
রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া এবং সরকারি ব্যয় বাড়ার কারণে অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম দুই মাসেই ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাস শেষে সরকারের নিট ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে নতুন করে নিট ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে ৯ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল সরকার।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, অর্থবছরের শুরুতে সাধারণত সরকারের রাজস্ব আদায় কম থাকে। অন্যদিকে, এ সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন ও সরকারি ব্যয় তুলনামূলক বেশি থাকায় ঋণের প্রয়োজনও বাড়ে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় ব্যাংকগুলোর হাতে তারল্য থাকছে এবং তারা ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এতে সরকারের ব্যাংকঋণ কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
তারা আরও বলেন, একদিকে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কারণে সরকারের ঋণের চাহিদা কিছুটা বেশি রয়েছে। তবে সামনে রাজস্ব আদায় বাড়লে সরকারের ব্যাংকঋণ স্বাভাবিক পর্যায়ে চলে আসতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্ট শেষে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি রয়েছে প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা।
এ সময়ে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকেও ১ হাজার ৩১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই), বিমা কোম্পানি ও ব্যক্তি আমানতকারীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকারের বর্তমান ঋণের স্থিতি কোনো নির্দিষ্ট দিন, মাস বা ছয় মাসে তৈরি হওয়া ঋণ নয়; বরং এটি এ যাবৎকালের সামগ্রিক বা পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ।
তিনি বলেন, "উন্নত রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে সরকারকে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়। এ কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।"
এদিকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়ছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুনে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ০ দশমিক ১২ শতাংশ। এরপর জুলাইয়ে তা বেড়ে ২ দশমিক ৫২ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তা আরও বেড়ে ১৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, এপ্রিলে ১৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ, জুনে ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং আগস্টে ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
রিজার্ভ মানি বলতে বাজারে থাকা নগদ অর্থ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর রাখা অর্থকে বোঝায়। এই অর্থ পরবর্তী সময়ে ব্যাংকঋণ ও আমানত সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে আরও বেশি অর্থপ্রবাহ তৈরি করতে পারে।
ব্যাংকিং খাত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার কারণে বাজারে বিপুল পরিমাণ টাকা সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম থাকায় রিজার্ভ মানি বাড়ছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অব্যাহত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উচ্চ নীতি সুদের হারসহ সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হলেও বিভিন্ন উপায়ে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ১ থেকে ৫ শতাংশ সুদে বিভিন্ন ধরনের ঋণ দিচ্ছে। পাশাপাশি সরকার ওয়েজ অ্যান্ড মিনস ও ওভারড্রাফটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ নিচ্ছে। এসব কার্যক্রম রিজার্ভ মানি বাড়াচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি কিনেছে। এর বিপরীতে বাজারে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রবেশ করেছে, যা রিজার্ভ মানি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় এখনও এর মানি মাল্টিপ্লায়ার প্রভাব খুব বেশি হয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতে বেসরকারি ঋণের চাহিদা বাড়লে এই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.