বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ভ্রমণ ও পর্যটনবিষয়ক এক গবেষণার 'ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স ২০২৬'-এ ১১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৮তম। তালিকায় উঠে আসা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এবারও সবার নিচে রয়েছে বাংলাদেশ।
সূচকটির ২০২৪ সালের সংস্করণে ১১৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৯তম। ৭-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩ দশমিক ১৯। ওই বছর এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সবার নিচে।
সর্বশেষ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর বেড়ে ৩ দশমিক ৩৪ হয়েছে। তবে তা এখনও বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪ দশমিক ১-এর নিচে। মূল্যায়ন করা দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৮টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে।
জুরিখ ইনস্যুরেন্স গ্রুপের সহযোগিতায় দুই বছর পরপর প্রকাশিত এই সূচকের সর্বশেষ সংস্করণ শুক্রবার প্রকাশ করা হয়। এতে ভ্রমণ ও পর্যটন খাতের টেকসই ও অভিঘাতসহনশীল উন্নয়নে সহায়ক বিভিন্ন উপাদান ও নীতিমালা মূল্যায়ন করা হয়েছে।
নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "বাংলাদেশে প্রাকৃতিক ও পরিবেশভিত্তিক পর্যটনের উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে। তবে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার যথেষ্ট উন্নয়ন হয়নি।"
তিনি বলেন, "আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদেশি পর্যটক আকর্ষণে বাংলাদেশের সীমিত সক্ষমতা। এখানকার পর্যটন মূলত দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে অনেক বিদেশি পর্যটনের পরিবর্তে কাজের প্রয়োজনে বাংলাদেশে আসেন এবং প্রায়ই মাত্র এক বা দুই রাত অবস্থান করেন।"
এই অর্থনীতিবিদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যটকের পাশাপাশি ধর্মীয়, প্রকৃতিনির্ভর ও আঞ্চলিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার দিকে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মোয়াজ্জেম বলেন, "পর্যটন খাত এখনও অনেকটাই আমলাতান্ত্রিক। নীতিনির্ধারণ, পরিচালনা এবং খাতটির লজিস্টিক কাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের আরও বেশি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটন উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো ও টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হবে।"
দক্ষিণ এশিয়ায় পর্যটনের ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে ভারত। ৪ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে দেশটির অবস্থান ৩১তম। এরপর ৩ দশমিক ৮৫ স্কোর নিয়ে শ্রীলঙ্কা ৬৯তম, ৩ দশমিক ৫৫ স্কোর নিয়ে নেপাল ৮৬তম এবং ৩ দশমিক ৪২ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান ৯৫তম অবস্থানে রয়েছে।
সূচকটিতে ১৭টি স্তম্ভের অধীনে ১০২টি সূচক রয়েছে। এগুলোকে ভাগ করা হয়েছে পাঁচটি মাত্রায়—সহায়ক পরিবেশ; ভ্রমণ ও পর্যটন নীতি ও সহায়ক শর্ত; অবকাঠামো ও সেবা; সম্পদ; এবং টেকসইতা।
এসব মাত্রার মধ্যে 'ভ্রমণ ও পর্যটন সম্পদ'-এ বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো করেছে। কোনো গন্তব্যে ভ্রমণের প্রধান আকর্ষণগুলো এই মাত্রায় বিবেচনা করা হয়। এর আওতায় প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও অবকাশবহির্ভূত সম্পদ—এই তিনটি স্তম্ভ রয়েছে।
অন্যদিকে 'ভ্রমণ ও পর্যটনের টেকসইতা' মাত্রায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল। ভ্রমণ ও পর্যটন খাতে বিদ্যমান বা সম্ভাব্য টেকসইতাবিষয়ক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি এই মাত্রায় মূল্যায়ন করা হয়।
ভিসার প্রয়োজনীয়তা, বিমান পরিষেবা চুক্তির সংখ্যা, ট্রাভেলস্যাট হসপিটালিটি রেপুটেশন ইনডেক্স এবং পাসপোর্ট মোবিলিটি স্কোরের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে দুর্বল ছিল।
এর পাশাপাশি পর্যটন সেবা ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সবচেয়ে দুর্বল।
বিশ্বব্যাপী উচ্চ আয়ের অর্থনীতিগুলো পর্যটন গন্তব্য হিসেবে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে এবার প্রথম স্থানে উঠে এসেছে জাপান। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এরপর রয়েছে যথাক্রমে স্পেন, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্স।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) জানিয়েছে, চলমান ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড ১৫০ কোটি পর্যটকের আগমন হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই প্রায় ৩০ কোটি ৭০ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করেছেন। সংস্থাটির মতে, এসব তথ্য স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে ভ্রমণ ও পর্যটনশিল্প কেবল মহামারির সময়কার মন্দা কাটিয়ে ওঠেনি, বরং এখন দ্রুত বিকশিত হচ্ছে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.