গণ্ডারের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল শরীর, মোটা চামড়া আর নাকের ওপর থাকা সেই বিখ্যাত শিং। দেখতে খানিকটা রাগী মনে হলেও গণ্ডার আসলে বেশ শান্ত স্বভাবের প্রাণী। তবে মানুষের তৈরি নানা বিপদের কারণে এই ‘শিংওয়ালা দৈত্য’ এখন নিজের অস্তিত্ব নিয়েই লড়ছে। গণ্ডার সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব গণ্ডার দিবস। দিনটি গণ্ডারের পাঁচটি প্রজাতি সম্পর্কে মানুষকে জানানো এবং তাদের রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। নাকের ওপর শিং, কিন্তু শিংটি আসলে কী? গণ্ডারের সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য তার শিং। কিন্তু মজার বিষয় হলো, গণ্ডারের শিং আসলে হাড় দিয়ে তৈরি নয়। এটি মূলত কেরাটিন দিয়ে তৈরি যে উপাদান মানুষের চুল ও নখেও রয়েছে। অর্থাৎ যে শিংয়ের জন্য গণ্ডারকে বছরের পর বছর শিকার করা হয়েছে, সেটি মূলত মানুষের চুল-নখের মতো একই ধরনের উপাদানে তৈরি! পৃথিবীতে আছে মাত্র পাঁচ প্রজাতি বর্তমানে পৃথিবীতে টিকে আছে পাঁচ প্রজাতির গণ্ডার সাদা গণ্ডার, কালো গণ্ডার, বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডার, জাভান গণ্ডার ও সুমাত্রান গণ্ডার। আন্তর্জাতিক গণ্ডার ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বন্য পরিবেশে বিশ্বে গণ্ডারের সংখ্যা ২৭ হাজারেরও কম। পাঁচ প্রজাতির মধ্যে চারটিই কোনো না কোনো মাত্রায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে সব গণ্ডারের গল্প একই নয়। কিছু প্রজাতির সংখ্যা সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে বাড়ছে। বিশেষ করে বৃহৎ একশৃঙ্গ গণ্ডারের সংখ্যা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গণ্ডারের সবচেয়ে বড় ‘শত্রু’ মানুষ গণ্ডারের সবচেয়ে বড় বিপদ তার নিজের শিং নয়, বরং মানুষের শিং নিয়ে তৈরি করা চাহিদা ও ভুল ধারণা। কিছু মানুষের মধ্যে গণ্ডারের শিংয়ের নানা তথাকথিত ঔষধি গুণ নিয়ে বিশ্বাস রয়েছে। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে গণ্ডারের শিংয়ের এমন কোনো প্রমাণিত ঔষধি গুণ নেই। এই ভুল ধারণা ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে প্রতিবছর বহু গণ্ডার শিকারিদের হাতে মারা যায়। শুধু শিকার নয়, বন ও তৃণভূমি ধ্বংসের কারণেও গণ্ডারের আবাসস্থল কমছে। ফলে খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও প্রজননের সুযোগ সবকিছুর ওপরই চাপ তৈরি হচ্ছে। গণ্ডার কি সত্যিই এত রাগী? ছবিতে গণ্ডারকে যতটা ভয়ংকর দেখায়, বাস্তবে তাদের আচরণ অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। তারা সাধারণত একা থাকতে পছন্দ করে এবং নিজেদের এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। বিপদ অনুভব করলে অবশ্য দ্রুত দৌড়াতে পারে। আরেকটি মজার তথ্য হলো, আকারে বিশাল হলেও গণ্ডার বেশ দ্রুত দৌড়াতে পারে। প্রজাতিভেদে তারা ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে ছুটতে পারে। শিং বাঁচলে গণ্ডারও বাঁচবে গণ্ডারকে বাঁচাতে শুধু চিড়িয়াখানা বা সংরক্ষিত এলাকায় তাদের রাখা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা, চোরাশিকার বন্ধ করা এবং গণ্ডারের শিং নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করা। বিশ্ব গণ্ডার দিবস তাই শুধু একটি প্রাণীর কথা মনে করার দিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ও প্রাচীন প্রাণীগুলোর একটি যেন মানুষের ভুল ধারণা ও লোভের কারণে হারিয়ে না যায়। গণ্ডারের শিং হয়তো তার পরিচয়, কিন্তু সেই শিং যেন তার মৃত্যুর কারণ না হয় বিশ্ব গণ্ডার দিবসে এটাই হোক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।