অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নতুন করে ভিসা নিয়ম কঠোর করছে অস্ট্রেলিয়ার সরকার। বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ সীমিত করা, ব্যাকপ্যাকারদের দীর্ঘ সময় থাকার ক্ষেত্রে নতুন নিয়ম চালু এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দেশটিতে থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক নতুন অভিবাসন নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সরকারের লক্ষ্য হলো নেট ওভারসিজ মাইগ্রেশন বা বিদেশ থেকে আসা-যাওয়ার নিট সংখ্যা কমিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় আনা। চলতি বছরে এই সংখ্যা ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ২৫ হাজারে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান ব্যুরোর নতুন তথ্য অনুযায়ী, মার্চ পর্যন্ত এক বছরে দেশটির নেট বিদেশি অভিবাসন কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ১০০ জনে।
টনি বার্ক বলেছেন, আবাসন সংকটের কারণে সরকার এখন নির্ধারিত অভিবাসন সংখ্যাকে শুধু পূর্বাভাস হিসেবে দেখছে না, বরং তা পূরণ করার লক্ষ্য হিসেবেই বিবেচনা করছে। তার ভাষায়, অভিবাসন ব্যবস্থার যেসব অংশ চাহিদার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে সরকারের আরও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের পরিবারের ওপর বিধিনিষেধ
নতুন নিয়মের বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় নিয়ে আসার সুযোগ সীমিত করা।
নতুন ভিসায় থাকা অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আর তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিতে পারবেন না। তবে অস্ট্রেলিয়ায় এরই মধ্যে যেসব পরিবার রয়েছে, তাদের আলাদা করা হবে না।
এ ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও আসিয়ানভুক্ত কিছু দেশের নাগরিক এবং পিএইচডির মতো নির্দিষ্ট কিছু কোর্সে পড়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম থাকবে।
শিক্ষার্থীদের এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় যাওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কেউ কোর্স পরিবর্তন করতে চাইলে নতুন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। একটি কোর্স শেষ করার পর সাধারণত তার চেয়ে উচ্চতর পর্যায়ের কোর্সে যাওয়ার সুযোগ থাকবে।
সরকারের ভাষায়, শুধু স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বারবার কোর্স পরিবর্তনের প্রবণতা বন্ধ করাই এর লক্ষ্য।
ব্যাকপ্যাকারদের জন্য লটারির ব্যবস্থা
অস্ট্রেলিয়ায় এক বছর থাকার পর আরও সময় কাটাতে চান এমন ব্যাকপ্যাকারদের জন্যও নতুন নিয়ম করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় বছর থাকার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার জায়গা রাখা হবে। আবেদনকারীদের আগে আঞ্চলিক এলাকায় ৮৮ দিন কাজ করতে হবে। এরপর তারা লটারিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
তৃতীয় বছর থাকার জন্য জায়গা আরও কমিয়ে মাত্র ৫ হাজার করা হবে। এ ক্ষেত্রে ছয় মাস আঞ্চলিক এলাকায় কাজ করার শর্ত থাকবে।
গত বছর প্রায় ৫৭ হাজার ব্যাকপ্যাকার দ্বিতীয় বছর এবং প্রায় ৩১ হাজার তৃতীয় বছর অস্ট্রেলিয়ায় থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। নতুন ব্যবস্থায় সবাইকে অতিরিক্ত বছর থাকার সুযোগ দেওয়া হবে না।
তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম থাকবে। অস্ট্রেলিয়া-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে ব্রিটিশ ব্যাকপ্যাকারদের জন্য আঞ্চলিক এলাকায় কাজ করার শর্ত আরোপ করা হবে না।
ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করবে সরকার।
এ জন্য আরও ১০০ জন কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ করা হবে এবং ২৫০টি নতুন আটককেন্দ্রের শয্যা তৈরি করা হবে। মেলবোর্নের সাবেক কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রটিকেও প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভিসা এজেন্টদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো এজেন্ট ভিত্তিহীন বা অগ্রহণযোগ্য দাবি করার জন্য আবেদনকারীদের উৎসাহিত করলে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
দক্ষ কর্মীদের স্থায়ী ভিসার পয়েন্ট ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন টনি বার্ক। নতুন ব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় দক্ষতাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষ করে বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত দক্ষ কর্মীদের যোগ্যতাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির সমপর্যায়ের গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, মৎস্য ও শিক্ষকতার মতো খাতের কর্মীদের ভিসা প্রক্রিয়ায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভিজিটর ভিসার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সাধারণভাবে এসব ভিসায় ‘নো ফার্দার স্টে’ বা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অন্য ভিসায় পরিবর্তনের সুযোগ না থাকার শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে কেউ ভিজিটর হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে পরে দেশটির ভেতর থেকে অন্য ভিসার আবেদন করে দীর্ঘ সময় থাকার সুযোগ কমবে।
টনি বার্কের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় অস্থায়ীভাবে আসতে চাইলে অস্থায়ী ভিসা এবং স্থায়ীভাবে আসতে চাইলে স্থায়ী ভিসার জন্য আবেদন করা উচিত। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে দেশ ছাড়তে হবে।
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন কমানোর অন্যতম কারণ হিসেবে আবাসন সংকটের কথা বলা হলেও টনি বার্ক বলেছেন, দেশের আবাসন সংকট শুধু অভিবাসনের কারণে তৈরি হয়নি। তবে তাঁর মতে, আবাসন সরবরাহ বাড়ার সঙ্গে অভিবাসনের গতি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, অভিবাসন খুব বেশি কমিয়ে দিলে নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে কর্মীর সংকট তৈরি হতে পারে।
সরকারের নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে অভিবাসনের সংখ্যা নির্ধারিত লক্ষ্যের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের অস্ট্রেলিয়ায় আসার সুযোগ বজায় রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।