ফুটবল মাঠে দীর্ঘদিনের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে দুজনের সেই দ্বৈরথ এখন আর নেই। তবে মাঠের বাইরেও নতুন এক জায়গায় যেন পাশাপাশি হাঁটছেন আধুনিক ফুটবলের দুই মহাতারকা। দুজনই এবার স্পেনের ক্লাব ফুটবলে বিনিয়োগ করছেন। আর সেটিকে স্প্যানিশ ফুটবলের জন্য বড় সম্মানের বিষয় বলে মনে করছেন লা লিগা সভাপতি হ্যাভিয়ের তেবাস।
৪১ বছর বয়সী রোনালদো চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউডি আলমেরিয়ার ২৫ শতাংশ শেয়ার কিনেছেন। অন্যদিকে ৩৯ বছর বয়সী মেসি এরই মধ্যে বার্সেলোনাভিত্তিক পঞ্চম বিভাগের ক্লাব কর্নেয়ায় মালিকানা নিয়েছেন। এর বাইরে দ্বিতীয় বিভাগের আরেক দল এলদেন্সে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যাপারে মেসির প্রাথমিক সমঝোতার খবরও সামনে এসেছে।
মেসির এলদেন্সে বিনিয়োগের বিষয়টি অবশ্য তেবাস নিজে এখনো নিশ্চিত নন। বুধবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যম থেকেই তিনি এ বিষয়ে জানতে পেরেছেন।
তেবাস বলেন, ‘এলদেন্সের বিষয়ে আমি সংবাদমাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছি। এটি সত্য কি না, মেসি নিজে ক্লাবটি কিনেছেন কি না, নাকি কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে হয়েছে- আমি জানি না।’
তবে মেসির বিনিয়োগের সত্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও রোনালদোর আলমেরিয়ায় মালিকানার বিষয়টি নিশ্চিত। আর সেটিকেই সামনে এনে তেবাস বলেন, স্পেনের ফুটবলে বিশ্বের দুই সেরা ফুটবলারের আগ্রহ তাদের জন্য গর্বের বিষয়।
লা লিগা সভাপতির ভাষায়, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, আলমেরিয়ার ২৫ শতাংশ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মালিকানায়। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোর বিশ্বের দুই সেরা ফুটবলার স্প্যানিশ ফুটবলে নিজেদের সঞ্চয়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করছেন এবং এটিকে আরও বড় করতে সাহায্য করতে চাইছেন—এটা আমাদের জন্য সম্মানের।’
মেসি ও রোনালদোর ফুটবল-জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় তৈরি হয়েছিল স্পেনে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেসি বার্সেলোনা এবং রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলেছেন। একই লিগে দুই দলের হয়ে নিয়মিত মুখোমুখি হওয়ায় তাদের ব্যক্তিগত দ্বৈরথ পরিণত হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
এই সময়ে দুজন মিলে জিতেছেন ৮১টি শিরোপা। ৯০০-এর বেশি গোল করা ইতিহাসের একমাত্র দুই খেলোয়াড়ও তারা। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে দুজনই ফুটবলকে দিয়েছেন অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত।
বার্সেলোনায় মেসির অধ্যায় ছিল ১৭ বছরের। ক্লাবটির হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের হয়ে সাফল্যের সুবাদে তিনি সাতবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। ২০২১ সালের আগস্টে বার্সেলোনার আর্থিক সংকটের কারণে ক্লাব ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
রোনালদোর রিয়াল মাদ্রিদ অধ্যায়ও ছিল সমান উজ্জ্বল। ২০১৮ সালে স্প্যানিশ ক্লাবটি ছাড়ার সময় তিনি ছিলেন রিয়ালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। মাদ্রিদে থাকাকালে জিতেছেন ১৩টি শিরোপা, যার মধ্যে রয়েছে চারটি চ্যাম্পিয়নস লিগ। পর্তুগালের অধিনায়ক হিসেবে জিতেছেন ২০১৬ সালের ইউরোও। তার ঝুলিতে রয়েছে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর।
মাঠের সেই পুরোনো দ্বৈরথ এখন অতীত। মেসি-রোনালদো দুজনই ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে মাঠ মাতানোর পর এবার ক্লাব মালিকানা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে স্প্যানিশ ফুটবলের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছেন তারা।
রোনালদোর আলমেরিয়ায় বিনিয়োগ এবং মেসির কর্নেয়া ও সম্ভাব্য এলদেন্স প্রকল্প তাই শুধু ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, স্প্যানিশ ফুটবলের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুই তারকার নাম যখন কোনো লিগ বা ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই প্রতিযোগিতার আকর্ষণ ও পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তেবাসের মন্তব্যে সেই বিষয়টিই স্পষ্ট- যে দুই তারকা একসময় স্পেনের ফুটবলকে মাঠে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছিলেন, তাদের বিনিয়োগের মাধ্যমে এবার মাঠের বাইরেও স্প্যানিশ ফুটবলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে।