সাইবার হামলার সামান্যতম আশঙ্কা তৈরি হলেই আগাম সুরক্ষার অজুহাতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
এতে সাধারণ নাগরিকের নিত্যদিনের ডিজিটাল সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে। বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কার্যকর সাইবার প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার ও সফটওয়্যার হালনাগাদ করে দ্রুত সেবা সচল রাখার বিকল্প পথ না খুঁজে কেবল পোর্টাল বন্ধ রাখাকেই মূল কৌশল হিসেবে বেছে নেওয়ায় ভবিষ্যতের সাইবার ওয়ারফেয়ার বা ডিজিটাল যুদ্ধ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে মারাত্মক নিরাপত্তা ছিদ্র ধরা পড়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্তত ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবার ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক যুগে শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে রাষ্ট্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং এশিয়া-প্যাসিফিক নেটওয়ার্ক ইনফরমেশন সেন্টারের (এপনিক) নির্বাহী কমিটির সদস্য সুমন আহমেদ সাবির জানান, আগামী দিনে যুদ্ধের প্রচলিত ধরন বদলে যাবে এবং সাইবার ওয়ারফেয়ার সেখানে সবচেয়ে প্রভাবশালী মাধ্যম হয়ে উঠবে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মেট্রোরেলের মতো আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অবকাঠামোগুলো ভবিষ্যতে সাইবার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এসব সংবেদনশীল স্থানে সাইবার বিভ্রাট ঘটলে জাতীয় পর্যায়ে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেবে। ফলে এখনই গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা, দুর্বলতা শনাক্তকরণ ও তাৎক্ষণিক মোকাবিলার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা দরকার।
প্রযুক্তি খাতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার এই ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরাও।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান, সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সির নিজস্ব টেকনিক্যাল জনবল না থাকায় দীর্ঘদিন নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে সম্প্রতি নতুন ১০০টি পদের অনুমোদন পাওয়া গেছে, যার সিংহভাগেই দক্ষ কারিগরি বিশেষজ্ঞ নিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম গতিশীল করা হবে।
তিনি আরও জানান, কোনো রাষ্ট্রই শতভাগ সাইবার ঝুঁকিমুক্ত নয়। সরকার সার্বিক অবকাঠামো শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে দ্রুততম সময়ে সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (এসওসি) ও নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বৈশ্বিক পিএইচপি সংকটের সূত্রপাত হয় সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান `উইজ`-এর গবেষকদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে।
গবেষকরা জানান, প্রোগ্রামিং ভাষাটির সার্ভার মেমোরি ব্যবস্থাপনায় দুটি মারাত্মক দুর্বলতা রয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দূর থেকেই ক্ষতিকর কোড বা স্ক্রিপ্ট চালিয়ে সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং সংরক্ষিত সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে সরকারের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক সংস্থা বাংলাদেশ কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিজিডি ই-গভ সার্ট) জরুরি সতর্কতা জারি করে। সার্টের নির্দেশনায় বলা হয়, সার্ভারের মেমোরি খালি করার পরও আগের রিকোয়েস্টের ডেটা অবশিষ্ট থেকে যাওয়ার কারিগরি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে হ্যাকাররা বিশেষভাবে তৈরি এইচটিটিপি রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে সার্ভারে অনুপ্রবেশ করতে পারে।
এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সার্ভারের সংস্করণ যাচাই করে নিরাপত্তা প্যাচ প্রয়োগের তাগিদ দেওয়া হয়।
ঝুঁকির মুখে বৃহস্পতিবার থেকে বন্ধ রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের বিষয়ে ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, সার্বিক ঝুঁকি নিরসনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইটি বিভাগ সার্বক্ষণিক কাজ করছে। আন্তর্জাতিক অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও একই ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই পোর্টালটি জনস্বার্থে পুনরায় চালু করা হবে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, প্রতিটি খাতের জন্য কার্যকর কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জোর দিয়ে বলেন, ঝুঁকি দেখা দিলেই ওয়েবসাইট সরাসরি বন্ধ করে রাখা কোনো টেকসই ও পেশাদার সমাধান নয়। এতে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক নাগরিক পরিষেবা মুখ থুবড়ে পড়ে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ, সার্বক্ষণিক নেটওয়ার্ক নজরদারি ও বিকল্প ট্রাফিকের ব্যবস্থা রেখে সেবা চালু রাখার কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য। প্রযুক্তি কেনা বা প্রকল্প গ্রহণের চেয়েও সাইবার সুরক্ষায় জবাবদিহি এবং দক্ষ প্রকৌশলী গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।