যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আসন্ন ভারত সফর ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী সোমবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে মুম্বাইয়ে বৈঠক করবেন রুবিও। এরপর তিনি গুজরাটের জামনগরে একটি তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন।
তবে সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে যাচ্ছেন না তিনি। এ নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো প্রশ্ন তুলেছে, দেশের শীর্ষ কূটনীতিককে কি নিজ দেশের মাটিতেই বিদেশি কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে ‘তলব’ করা হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের এক বক্তব্যের পর এ বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আশা করছে, জয়শঙ্করসহ ভারতের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রুবিওর সঙ্গে দেখা করতে মুম্বাই যাবেন। বিরোধী কংগ্রেস দলের নেতারা এ বক্তব্যকে ভারতের কূটনৈতিক মর্যাদার জন্য অস্বস্তিকর বলে সমালোচনা করেছেন।
এমন এক সময়ে এ বিতর্ক সামনে এল, যখন বাণিজ্য, শুল্ক এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে।
কী নিয়ে আলোচনা করবেন রুবিও? মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে ‘সি৫+১’ সম্মেলনে অংশ নিতে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ সফর শেষে রবিবার ভারতে পৌঁছানোর কথা রুবিওর। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, সফরে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব, জ্বালানি সহযোগিতা ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের বৈঠকে জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালিত বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার পরিদর্শন করবেন রুবিও। সেখানে আম্বানি পরিবারের আয়োজিত একটি সংবর্ধনাতেও তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দিল্লি বাদ দেওয়ার কারণ কী? রুবিও কেন নয়াদিল্লি সফর করছেন না, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও কারণ জানায়নি। তবে তার সফরের জ্বালানি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে জামনগরের গুরুত্ব রয়েছে।
ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী রিলায়েন্স যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জ্বালানি কূটনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা রিলায়েন্স। ওয়াশিংটনও ভারতকে ভেনেজুয়েলার তেল কেনার বিষয়ে উৎসাহিত করছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করছে রিলায়েন্স। গত মার্চে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রকল্পকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন বলে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
‘তলব’ বিতর্কে সরব বিরোধীরা বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ব্লুমবার্গ নিউ ইকোনমি ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর বলেন, রুবিওর সঙ্গে বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটন জয়শঙ্কর ও ভারতের অন্য কর্মকর্তাদের মুম্বাই যাওয়ার প্রত্যাশা করছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ‘বেশ অস্বাভাবিক’।
লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী আরও কড়া ভাষায় মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, রুবিও যেন নিজের কর্মচারীকে মুম্বাইয়ে তলব করেছেন। কংগ্রেস নেতা পবন খেরাও বলেন, ভারতের মাটিতে বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তলব করা নজিরবিহীন ঘটনা।
বাণিজ্য ও রাশিয়ার তেল নিয়ে টানাপোড়েন গত বছর বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর ভারতীয় অধিকাংশ পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের সমঝোতার কাঠামোর আওতায় তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। তবে পরবর্তী আলোচনা থমকে গেছে।
ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এ মাসে বলেছেন, আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল অবশ্য জানিয়েছেন, চুক্তির প্রথম ধাপ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় ভারতীয় রফতানিকারকেরা সুবিধা না পেলে নয়াদিল্লি চুক্তিতে সই করবে না।
রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতের তেল কেনাও দুই দেশের সম্পর্কে বড় বিরোধের কারণ। সম্প্রতি রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জোরদারের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আইনে রুশ তেল বা গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তেলের উচ্চমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে চাপ কমানোর চেষ্টা হিসেবে শুক্রবার ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়ার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন।
এত টানাপোড়েন সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বেড়েছে। কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ গবেষক সমীর লালওয়ানির মতে, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে জনমনে ধারণার অবনতি ঘটলেও কৌশলগত সহযোগিতার ভিত্তি এখনও টিকে আছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ১২ শতাংশ বেড়ে ২৪০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
রুবিওর দিল্লি সফর এড়িয়ে মুম্বাইয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাই শুধু সফরসূচি নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও জ্বালানিনীতি ঘিরে চলমান টানাপোড়েনেরও প্রতিফলন। সূত্র: [আল-জাজিরা](https://www.aljazeera.com/news/2026/10/18/why-marco-rubios-visit-to-mumbai-has-ruffled-feathers-in-india)