প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় রাজধানীর আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছে সরকার। আজ রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য একটি প্রস্তাব উঠতে যাচ্ছে।
সরকারের ৫৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি রয়েছে বর্তমান সচিবালয় প্রাঙ্গণে। এই মন্ত্রণালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে মাত্র ১৮ লাখ বর্গফুট জায়গার মধ্যে। প্রস্তাবিত নতুন সচিবালয়ে প্রায় ৩০ লাখ বর্গফুট জায়গা থাকবে, যেখানে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংস্থান করা সম্ভব হবে। প্রধানমন্ত্রী নিজের বর্তমান মেয়াদের মধ্যেই নতুন সচিবালয়ে অফিস স্থানান্তর করতে চান বলে এ সংক্রান্ত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত অন্তত দুজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে নিশ্চিত করেছেন।
বিকেল সাড়ে ৪টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার সাপ্তাহিক বৈঠক অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত আছে। ওই বৈঠকেই সচিবালয় স্থানান্তর সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করা হচ্ছে বলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার একাধিকবার সচিবালয় স্থানান্তরের চিন্তা করলেও সেই পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো বর্তমান সচিবালয়ের ভেতরের ফাঁকা জায়গায় দুটি ২০ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এপ্রিলে সচিবালয়ের ভেতরে আরও একটি ২১ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) উত্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী এতে অনুমোদন না দিয়ে শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় স্থাপনের পরিকল্পনা নিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় স্থাপত্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গত ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সচিবালয় স্থানান্তরের একটি খসড়া পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। ওই বৈঠকেই বিস্তারিত ও চূড়ান্ত পরিকল্পনা মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সচিবালয়ে বর্তমানে ১২টি প্রধান ভবন আছে, যার মধ্যে ৮টির অবস্থাই বেশ নাজুক। এগুলোর অধিকাংশই ১৯৬০-এর দশকে নির্মিত। এসব জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন করে নির্মাণের বিষয়টি সামনে এলে সার্বিকভাবে সচিবালয় স্থানান্তরের আলোচনা বেগবান হয়।’
প্রখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের স্থাপত্য ঐতিহ্য বজায় রেখে প্রতিটি ভবন ১২ থেকে ১৪ তলাবিশিষ্ট বারোটি ভবন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় হতে পারে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নকশায় নতুন সচিবালয়ের চারপাশে একটি সার্কুলার বা চক্রাকার সড়ক থাকবে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মসজিদ, জিমনেসিয়াম, নান্দনিক ফোয়ারা, সুপরিসর পার্কিং এবং কেন্দ্রীয় কনভেনশন সেন্টারসহ আধুনিক সব প্রশাসনিক সুবিধাই রাখা হচ্ছে এতে।
স্থান সংকুলান ও আধুনিক কর্মপরিবেশের বিষয়ে পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এখনকার মতো অফিসারদের প্রত্যেকের জন্য পৃথক কক্ষের ব্যবস্থা থাকবে না। কেবল শীর্ষ দুই স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ রাখা হতে পারে। বাকিদের জন্য করপোরেট সংস্কৃতির আদলে উন্মুক্ত ফ্লোরে গ্লাস বা বোর্ড পার্টিশন ব্যবস্থা থাকবে। এতে কম জায়গায় স্বচ্ছন্দে অনেক বেশি কর্মকর্তা কাজ করতে পারবেন।’
সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জানতে চাইলে গত মঙ্গলবার গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সাংবাদিকদের বলেন, ‘সচিবালয়ের ভেতরে দাপ্তরিক কাজের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই, আর পার্কিংয়ের তীব্র সমস্যা তো রয়েছেই। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে মন্ত্রিসভা থেকেই।’
সরকারের এই স্থানান্তরের খসড়া পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনের আয়োজনের পর তারা প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি পেশ করেন।
ওই দিন শেকৃবির ‘গবেষণা মাঠ পুনরুদ্ধার স্টিয়ারিং কমিটি’র আহ্বায়ক অধ্যাপক এম সালাউদ্দিন এম চৌধুরী বলেন, ‘এই মাঠের সবুজায়ন, গাছপালা ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে আমরা সেখানে উচ্চতর কৃষি গবেষণা চালাতে চাই। আমাদের লক্ষ্য শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ রক্ষা নয়, ঢাকার ফুসফুস রক্ষা করাও।’
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরোধিতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর গতকাল রাতে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়টি আমরা অবগত আছি। তাদের জন্য এর চেয়েও বড় বা উপযুক্ত জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার বিষয় সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। আশা করি, এটি কোনো বড় সংকট তৈরি করবে না।’