1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৫ অপরাহ্ন

সুলতান মাহমুদ গজনবির ভারত অভিযান নিয়ে ঔপনিবেশিক বয়ান ও ঐতিহাসিক সত্য

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১২ Time View

সুলতান মাহমুদ গজনবির ভারত অভিযানকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ধারণার সাথে বাস্তব ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণের বিশাল ফারাক রয়েছে।

উপমহাদেশে মুসলমানদের আগমন এ অঞ্চলের জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোয় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশাল অংশ সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম শাসকদের সাথে তাদের একটি সাধারণ পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল। নাগরিকরা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতেন এবং ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

আঠারো শতকে ইংরেজ বেনিয়া শক্তি এ দেশে উপনিবেশ স্থাপনের পর রাজনৈতিক স্বার্থে সেই সম্প্রীতির বন্ধনে আঘাত হানে।

নিজেদের দখলদারিত্ব পাকাপোক্ত করতে তারা মুসলিম শাসনকালকে অন্ধকার যুগ হিসেবে প্রচার করা শুরু করে। দীর্ঘকাল ধরে সৌহার্দ্যের সাথে বসবাস করা হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ তৈরি করাই ছিল তাদের বিভাজন ও শাসন নীতির মূল কৌশল।

এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপন। সেখানে মুসলিম সুলতানদের সনাতন ধর্ম ও মন্দির ধ্বংসকারী রক্তপিপাসু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চালানো হয়। আর এই প্রচারণায় সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল সুলতান মাহমুদ গজনবিকে।

ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদরা মাহমুদ গজনবিকে নিষ্ঠুর, লোভী ও ধর্মান্ধ হিসেবে চিত্রিত করে দাবি করেন, তিনি তরবারির জোরে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এই পরিকল্পিত অপপ্রচার শুধু সাধারণ সমাজেই নয়, বহু আধুনিক গবেষকের চিন্তাভাবনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

উপনিবেশকালের ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্যমূলক রূপ নিয়ে বিশিষ্ট গবেষক সৈয়দ সুলায়মান নদবি তাঁর আরব ও হিন্দ কে তাল্লুকাত গ্রন্থে লিখেছেন, সেই যুগে রচিত ভারতের ইতিহাস ছিল বিশেষ উদ্দেশ্যে সাজানো। সেখানে আলেকজান্ডারের আক্রমণকে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণ হিসেবে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে। অথচ মুসলমানদের ইতিহাসে এসে লেখকেরা আরবদের অভিযানের কথা সংক্ষেপে বলেই গজনবির লুণ্ঠনবৃত্তির বিবরণ দিয়ে মধ্যযুগের ইতিহাস শুরু করেন।

ঐতিহাসিক দলিল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গজনবির বর্বরতার যেসব গল্প প্রচলিত আছে তার কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।

যুদ্ধে অনন্দপালকে পরাজিত করার পর গজনবি নগরকোট থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জনপদ অতিক্রম করেছিলেন। সেই সময় কোনো প্রতিরোধকারী শক্তি উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও তিনি সেখানকার সাধারণ জনপদে কোনো লুণ্ঠন বা রক্তপাত চালাননি। তাঁর প্রস্থানের পর অনন্দপাল নির্বিঘ্নে রাজধানী লাহোরে ফিরে এসেছিলেন।

একইভাবে কনৌজের সমৃদ্ধ নগরীর রাজা আত্মসমর্পণ করে ক্ষমাপ্রার্থনা করলে সুলতান তাঁকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন। লোভী কিংবা রক্তপিপাসু হলে তিনি সেই ধনী নগরী ধ্বংস করতে পারতেন, যা তিনি করেননি।

ঐতিহাসিকদের মতে, মাহমুদ গজনবি ঢালাওভাবে কোনো উপাসনালয় ভাঙেননি। কেবল ষড়যন্ত্র ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্থাপনাগুলোই সামরিক অভিযানের শিকার হয়েছিল।

থানেশ্বর অভিযানে মন্দির ও মূর্তি ভাঙার ঘটনা ঘটলেও সেই অভিযানে তাঁর নিজস্ব বাহিনীতেই ছিল বারো হাজার হিন্দু সেনা। ঐতিহাসিক আকবর শাহ নাজিবাবাদীর আয়নায়ে হাকিকত নুমা গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, স্বয়ং হিন্দু সেনাদের চিহ্নিত করা স্থানেই আক্রমণ পরিচালিত হয়েছিল এবং এতে সৈন্যদের মাঝে কোনো অসন্তোষ দেখা যায়নি।

তিনি জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করেননি। গবেষক ড. ঈশ্বর টোপা তাঁর পলিটিক্স ইন প্রি-মুঘল টাইমস গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে গজনবি কাউকে হত্যা করেছিলেন এমন প্রমাণ ইতিহাসে নেই। তাঁর শাসনামলে হিন্দুরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা পেতেন এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কোনো বাধা ছাড়াই রাজকীয় সেনাবাহিনীতে পদ পেতেন।

রাজা জয়পালকে বন্দি করে গজনিতে আট মাস রাখার পরও তাঁর ওপর কোনো ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। তিনি নিজ ধর্ম বজায় রেখেই ফিরে এসেছিলেন।

ইতিহাস গবেষক ড. মুহাম্মদ নাজিম তাঁর দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অব সুলতান মাহমুদ অব গজনা গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, সুলতানের আমলে হিন্দুরা সম্পূর্ণ সহনশীল পরিবেশে বাস করত। এমনকি গজনিতে তাদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসিক এলাকা এবং স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার পালনের পূর্ণ সুযোগ ছিল।

গজনবির সোমনাথ অভিযান নিয়েও ঔপনিবেশিক যুগে সবচেয়ে বেশি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রোমিলা থাপার দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রমাণ করেছেন, সোমনাথ ধ্বংসের বিবরণ ব্যাপকভাবে অতিরঞ্জিত। সুলতান কখনোই সোমনাথকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করেননি।

রোমিলা থাপারের গবেষণা বলছে, মুসলিম আগমনের বহু আগে থেকেই ভারতে স্থানীয় রাজাদের মধ্যে একে অপরের মন্দির আক্রমণ ও ধনরত্ন লুটের রেওয়াজ ছিল। রাষ্ট্রকূট রাজা তৃতীয় ইন্দ্রের কাল্পী মন্দির ধ্বংস, পরমার রাজা সুভটবর্মণের জৈন মন্দির লুণ্ঠন এবং কাশ্মীরের রাজা শঙ্করবর্মণের চৌষট্টিটি মন্দির লুটের ঐতিহাসিক বিবরণ কল্হণের রাজতরঙ্গিনীতে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা হিন্দু-মুসলিম বিভেদ গভীর করতেই সোমনাথের ঘটনাকে রাজনৈতিক ট্রমা হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

এমনকি ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবরোর প্রচারিত সেই বিখ্যাত দাবি—গজনবি সোমনাথের চন্দন কাঠের দরজা খুলে নিয়ে গিয়েছিলেন—সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। রোমিলা থাপার নিশ্চিত করেছেন, সমসাময়িক কোনো তুর্কি বা ফারসি নথিতে সোমনাথের দরজা নিয়ে যাওয়ার কোনো উল্লেখ নেই।

ইতিহাসকে সাম্প্রদায়িক স্বার্থে ব্যবহার করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা যে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিল, নির্মোহ গবেষণার মাধ্যমেই কেবল তার সঠিক ঐতিহাসিক মূল্যায়ন সম্ভব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ