বিতর্কিত পরিকল্পনা বাতিল করেছেন আগেই। এবার ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চাইলেন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। কিন্তু তাতেও মন গলেনি ইংল্যান্ড ও জার্মানির ফুটবল কর্তাদের। তাদের অভিযোগ, শুধু ক্ষমা চেয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই ফিফা সভাপতির। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তন ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন তারা।
বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার পরিকল্পনা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সমালোচনার মুখে রয়েছেন ইনফান্তিনো। 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ' (এফএফই) নামের সেই প্রকল্প ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যেই বৃহস্পতিবার সুইজারল্যান্ডের জুরিখে বৈঠকে বসে ফিফা কাউন্সিল।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রকল্পটি নিয়ে সদস্যদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করার জন্য ক্ষমা চান ফিফা সভাপতি। পরে ফিফার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বিষয়টি নিজেই জানান তিনি, 'ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ প্রকল্প নিয়ে যোগাযোগ ও আলোচনা প্রক্রিয়ায় আমরা যে ভুলগুলো করেছি, প্রথমেই সে জন্য আমি ক্ষমা চেয়েছি। সেই ভুলের কারণেই অনেক কিছু ঘটেছে।'
তবে বিতর্কিত প্রকল্পটি কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়নি বলেও মনে করিয়ে দেন ইনফান্তিনো, 'এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি কেবল একটি প্রস্তাব ছিল। কোনোভাবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না।'
ফিফার পরিকল্পনা ছিল, বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। সেই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু মালিকানা বিক্রি করা হবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে। ইনফান্তিনোর যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু প্রকল্পটি নিয়ে ফিফা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে আগেভাগে আলোচনা না করায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করতে বাধ্য হন ইনফান্তিনো। তবে প্রকল্প বাতিলের পরও এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে সেই প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বের্ন্ড নয়েনডর্ফ। তার মতে, ফিফার বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো ও পরিচালনা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। তবে ইনফান্তিনোকে দায়িত্বে রেখে সেই সংস্কার সম্ভব নয়।
নয়েনডর্ফ বলেন, 'প্রথমত, আমাদের সংস্কার প্রয়োজন। এটা সত্যি এবং সবাই তা জানে। বর্তমান প্রশাসন ও পুরো পরিচালনা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। কিন্তু আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, ইনফান্তিনোকে দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। তাই আমাদের সম্পূর্ণ নতুনভাবে শুরু করতে হবে। নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও নতুন শুরু প্রয়োজন।'
ইনফান্তিনোর ক্ষমা চাওয়ার আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জার্মান ফুটবলপ্রধান, 'আমার মনে হয়নি, তিনি পুরো এফএফই প্রকল্পের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আমার ধারণা, প্রকল্পটি কাউন্সিলের সামনে না আনা এবং কাউকে আলোচনায় যুক্ত না করার জন্যই তিনি ক্ষমা চেয়েছেন।'
তার অভিযোগ, ফিফার গুরুত্বপূর্ণ এই পরিকল্পনার কথা কাউন্সিলের সদস্যদের অনেকেই প্রথম জানতে পেরেছিলেন সংবাদমাধ্যম থেকে। অন্যান্য মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার প্রতিনিধিরাও একই বিষয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন।
এদিকে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারপারসন ডেবি হিউয়েট, 'তাকে অবশ্যই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। আর তিনি যদি সেসব প্রশ্নের উত্তর না দেন, তাহলে ফিফা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন।'
এফএফই প্রকল্প সংক্রান্ত নথিপত্র কাউন্সিলের সদস্যদের সামনে প্রকাশ করারও দাবি জানিয়েছেন হিউয়েট, 'আমাদের সবারই দায়িত্ব রয়েছে এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করার। তিনি আমাদের প্রশ্ন জমা দিতে বলেছেন। আমরা অনেক প্রশ্ন করেছি। এখন সেগুলোর খোলামেলা উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর।'
এরপর সরাসরি ইনফান্তিনোর উদ্দেশে তার প্রশ্ন, 'যদি লুকানোর কিছুই না থাকে, তাহলে এফএফই প্রকল্পের নথিগুলো আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছেন না কেন? বিষয়টি নিয়ে যদি সত্যিই এত অনুতপ্ত হন, তাহলে নথিগুলো প্রকাশ করুন।'
শুধু বাণিজ্যিক প্রকল্পই নয়, ফিফার সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন হিউয়েট। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্বকাপে লাল কার্ড দেখা যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনের স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত।
হিউয়েটের মতে, এসব সিদ্ধান্ত কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট না হলে ফিফার পরিচালনা ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার আনা সম্ভব নয়। তবে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সবাই এক অবস্থানে নেই। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি ফুটবল সংস্থার সমর্থন এখনও রয়েছে তার পাশে।