চলতি বছর দেশের অধিকাংশ এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তবে সিলেট ও রংপুর বিভাগ আক্রান্ত রোগী তুলনামূলক কম।
এক সময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে সীমাবদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোগটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি খুলনা ও বরিশালের মতো উপকূলীয় বিভাগগুলোতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।
তবে রেকর্ড অনুসারে, সিলেট ও রংপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কম।
এ বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছুঁই ছুঁই, এবং মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে রংপুরে ১ হাজার ৬১ জন আক্রান্ত হয়েছেন, তবে কোনো মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়নি। অন্যদিকে, সিলেটে আক্রান্ত হয়েছেন ৪২৬ জন এবং মারা গেছেন দুজন, বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
২০২৩ সালে বাংলাদেশে আক্রান্ত ও ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল সর্বোচ্চ। ওই বছর দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত ও ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। সে বছর সিলেটে ১ হাজার ৪৩৫ জন আক্রান্ত হয় এবং একজন মারা যান। অন্যদিকে, রংপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫৪০ এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। এর মধ্যে সিলেটে ৪২৬ জন আক্রান্ত হয় এবং দুজন মারা যায়। রংপুরে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬১, তবে কোনো মৃত্যু হয়নি। ২০২৪ সালেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক মাহবুবুল আলম মনে করেন, এ বিভাগে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকার কারণ ভারী বৃষ্টিপাত, মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ও এডিস ইজিপ্টাই মশার প্রায় অনুপস্থিত।
তিনি বলেন, সিলেটে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এতে পানি প্রবাহিত থাকে এবং পানি জমে থাকা ও মশার প্রজননের সুযোগ কমে যায়।
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীদের অধিকাংশই ঢাকা থেকে এসেছেন। এতে ধারণা করা যায়, তারা সেখানেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।
মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধন অভিযানকেও তিনি কৃতিত্ব দেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ জিএম সাইফুর রহমান বলেন, রংপুরে নগরায়ণ ও মানুষের যাতায়াত তুলনামূলক কম এবং শিল্পায়ন সীমিত। সে কারণে সেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘নগরায়ণ ও ডেঙ্গু সংক্রমণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। শহরাঞ্চলে পানি জমে থাকার জায়গা বেশি থাকে, যা মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।’
‘এ কারণে প্রতিবেশী রাজশাহী বিভাগের তুলনায় রংপুরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম থাকার বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়। রাজশাহী বিভাগে নগরায়ণ বাড়ছে,’ যোগ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ওয়াজেদ আলী সম্ভাব্য কারণ হিসেবে রংপুর থেকে ঢাকা ও ডেঙ্গুপ্রবণ অন্যান্য এলাকায় মানুষের কম যাতায়াত ও এডিস মশার কম ঘনত্বের কথা উল্লেখ করেন।
খুলনা ও বরিশালের মতো উপকূলীয় এলাকায় এডিস মশার প্রজননের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ রয়েছে, বলেন সাইফুর।
তিনি বলেন, লবণাক্ততার কারণে অনেক পরিবারকে পাত্র ও ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখতে হয়। এতে মশার প্রজননের সম্ভাব্য স্থান তৈরি হয়, বিশেষ করে বড় পাত্রগুলোতে, যেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা কঠিন।
তিনি আরও বলেন, উপকূলীয় এলাকায় আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং বৃষ্টিপাত বেশি হয়। এতে মশার প্রজননে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যায় ঢাকার পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে খুলনা। আর উভয় ক্ষেত্রেই বরিশালের অবস্থান চতুর্থ।