দুর্গাপূজা সামনে রেখে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শিল্পীরা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা।
এদিকে, পূজার সাজসজ্জার সরঞ্জাম বিক্রির বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। পূজার আর মাত্র আট দিন বাকি থাকলেও শাঁখারীবাজারের দোকানগুলোতে প্রত্যাশিত ক্রেতার দেখা নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে প্রতিমা তৈরির কয়েকটি শিল্পালয় ঘুরে দেখা যায়, কারিগররা দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। সময় কম থাকায় কাজ শেষ করতে কোথাও কোথাও অতিরিক্ত কারিগর নিয়োগ করা হয়েছে। আবার কারিগর সংকটে কয়েকটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ এখনো শুরু হয়নি।
প্রতিমাশিল্পী বিপ্লব দাস দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, এ বছর তিনি তিনটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন। প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিমা তৈরির জন্য ৮৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। গত বছর পারিশ্রমিক ছিল ৮০ হাজার টাকার কম।
তিনি বলেন, ‘প্রতিমা তৈরির সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় এ বছর প্রতিমা তৈরির খরচও বেড়েছে।’
আরেক প্রতিমাশিল্পী গোপাল পাল জানান, হাতে সময় খুব কম। এই সময়ের মধ্যেই প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে হবে। তাই দিনরাত কাজ করছেন তারা।
তিনি বলেন, ‘এখনো আমরা রঙের কাজ শুরু করতে পারিনি। আজকের মধ্যে মাটির কাজ শেষ করব। এরপর প্রতিমা শুকিয়ে রঙ করব।’
গোপাল পালও জানান প্রতিমা তৈরিতে খরচ বাড়ার কথা। তিনি বলেন, ‘প্রতিমা তৈরির পর সেগুলো সাজানোর জন্য অলংকার, শাড়ি ও কাপড়ের প্রয়োজন হয়। মণ্ডপের আয়োজকদের চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী প্রতিমার সাজসজ্জা করা হয়।’
এদিকে, শাঁখারীবাজারে সাজসজ্জার সরঞ্জামের দোকানগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
‘সাজঘর’ দোকানের মালিক রতন দপ্তর দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ বছর পূজার বিভিন্ন সরঞ্জামের দাম বেড়েছে। এতে ক্রেতাদের কেনাকাটায় প্রভাব পড়ছে।’
তিনি জানান, দেবীর চূড়ার সেটের দাম আগে ছিল ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকা। এখন তা ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। দেবীর চুলের দাম ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ টাকা হয়েছে। শাড়ির দাম প্রতি গজ ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। তুলনামূলক ভালো মানের শাড়ির দাম গজ প্রতি ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে।
বাজার ঘুরে আরও দেখা যায়, এক লাইনের মালার দাম ২০ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হয়েছে। ভালো মানের একটি সম্পূর্ণ মালার দাম গত বছরের তুলনায় ১০০ টাকা করে বেড়েছে। মুকুটের সর্বনিম্ন দাম ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়েছে। অস্ত্রের সর্বনিম্ন দাম ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে। আগে যে অস্ত্রের দাম ছিল সর্বোচ্চ ৭৫০ টাকা, এখন তা বেড়ে এক হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পুঁতির মালার দাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে।
শাঁখারীবাজারের আরেক প্রতিষ্ঠান ‘ঢাকেশ্বরী শঙ্খ শিল্পালয় অ্যান্ড বাসনালয়ের’ মালিক দীপক ধর বলেন, ‘আগে দুর্গাপূজার এই সময়ে দোকানে এত ভিড় থাকত যে কথা বলারও সুযোগ হতো না। এখন বেচাকেনার অবস্থা ভালো না।’
তিনি জানান, পণ্যের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া। পূজার অধিকাংশ সরঞ্জাম ভারত থেকে আমদানি করা হয়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে।
তবে সরজমিনে দেখা যায়, সব পণ্যের দাম বাড়েনি।
ঢাকঢোল নির্মাণের কারিগর শুভ মণ্ডল বলেন, ‘অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়লেও এ বছর ঢাকের দাম বরং কমেছে। আগে একটি ঢাক ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। এবার তা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।’
শাঁখারীবাজারে পূজার সরঞ্জাম কিনতে আসা জয় সাহা বলেন, ‘এ বছর সব পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার আমার বাজেটও কম। তাই সীমিত বাজেটের মধ্যেই কেনাকাটা শেষ করার চেষ্টা করছি।’
তাঁতীবাজার পূজা কমিটির সভাপতি চন্দন দে জানান, এ বছর শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। শেষ সময়ে সুন্দরভাবে পূজার আয়োজন শেষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন তারা।
পূজা মণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন বলে জানান তিনি।
চন্দন দে বলেন, ‘প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যাতে নির্বিঘ্নে পূজা শেষ করা যায়।’