প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের উর্বর বরেন্দ্রভূমির আদিগন্ত সবুজ প্রকৃতিতে ঘেরা নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী জনপদ হলো ঘুঘুডাঙ্গা গ্রাম। নওগাঁ জেলা সদর থেকে প্রায় সাতচল্লিশ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং নিয়ামতপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার উত্তরে হাজীনগর ইউনিয়নে এই গ্রামটির অবস্থান। কপতগোত্রের শান্ত ও লাজুক স্বভাবের ঘুঘু পাখির আনাগোনা বেশি থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ভালোবেসে এই গ্রামের নাম রেখেছেন ঘুঘুডাঙ্গা।
বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত এই এলাকার মাটি পলিযুক্ত ও উর্বর হওয়ায় এখানকার প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি হলো কৃষি।
ঘুঘুডাঙ্গা সহ পুরো নিয়ামতপুর উপজেলা ধান উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এখানকার উৎপাদিত প্রধান ফসলের মধ্যে ধান ও আমের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে নওগাঁ জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে, যার মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের অবদান উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় হাটবাজার হয়ে এখানকার আম জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, খুলনা ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। ধানের পাশাপাশি এখানকার কৃষকরা বিভিন্ন শাকসবজি, শীতকালীন ফসল এবং ড্রাগন ফল, মালটা ও আমড়ার মতো ফলমূল চাষ করে থাকেন।
কৃষিকাজের পাশাপাশি গবাদি পশু পালন ও হাঁস-মুরগি লালনপালন এ গ্রামের মানুষের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস।
প্রতিটি বাড়িতে গবাদি পশু থাকার কারণে গোবরের কোনো অভাব হয় না। সংগৃহীত গোবর দিয়ে মহিলারা রোদে শুকিয়ে ঐতিহ্যবাহী ঘুটে তৈরি করেন, যা সারা বছরের জ্বালানি চাহিদা মেটায়। এ ছাড়া ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের আরেকটি বড় ঐতিহ্য হলো একতলা ও দোতলা মাটির ঘর। শক্ত ও আঠালো এঁটেল মাটির ব্লক দিয়ে তৈরি এই ঘরগুলোর দেয়াল সাধারণত বিশ থেকে ত্রিশ ইঞ্চি চওড়া হয় এবং এর ছাদ টিন বা মাটির টালির তৈরি। শতবর্ষী এসব মাটির ঘরের দোতলায় কেউ কেউ ফসল রাখার গোলাঘর হিসেবে ব্যবহার করেন।
ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের আরও একটি প্রধান আকর্ষণ হলো হাজীনগর ইউনিয়নের মজুমদার মোড় থেকে ঘুঘুডাঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত দুই কিলোমিটার দীর্ঘ বিখ্যাত ‘তালসড়ক’।
এই সড়কের দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত আকাশচুম্বী তালগাছ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সাধনচন্দ্র মজুমদারের অধীনে কর্মরত ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারের উদ্যোগে এবং স্থানীয় শ্রমিকদের সহায়তায় এই তালগাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এই তালসড়কটি একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। দুপুরের পর থেকে দেশের দূরদূরান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসেন।
তালসড়কের পাশাপাশি এখানকার নারীদের হাতের তৈরি ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
গ্রামের মহিলারা সুচিশিল্পের মাধ্যমে ওমানের জাতীয় টুপি ‘কুম্মা’ তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রপ্তানি করছেন। নওগাঁর প্রায় পাঁচ হাজার সুচিশিল্পীর তৈরি এসব টুপি রপ্তানির মাধ্যমে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। এ ছাড়া গ্রামের পাশেই অবস্থিত পদ্মদিঘির মনোরম দৃশ্য এবং স্থানীয় রেস্তোরাঁ ও মেলা দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। সবমিলিয়ে বরেন্দ্রভূমির ঐতিহ্য, প্রকৃতি এবং মানুষের কর্মনিষ্ঠ জীবনের এক অনন্য মেলবন্ধন হলো নিয়ামতপুরের ঘুঘুডাঙ্গা গ্রাম।