বুয়েনস এইরেসের এক মহিমান্বিত সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। বাংলাদেশে যখন নতুন ভোরের সূর্যোদয়, তখন মনুমেন্তালে সমাপ্তি হলো এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের। বিদায়ী ম্যাচে মেসি পরলেন বিজয়ের মুকুট। ৩-০ গোলে হেরেও ফুটবল জাদুকরের লাস্ট ডান্সের সাক্ষী হয়ে রইল পশ্চিম আফ্রিকায় গিনি উপসাগরের ছোট্ট দেশ বেনিন। ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও সেই চিরচেনা রূপে ধরা দিলেন বিশ্বকাপজয়ী মহাতারকা। নিজে গোল করলেন, সতীর্থদের দিয়ে করালেন। ঐতিহাসিক স্তাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় রাত ৮টায় খেলা শুরুর কথা থাকলেও নানা আনুষ্ঠানিকতা ও দর্শকদের বাঁধভাঙা উল্লাসের কারণে কিক-অফের বাঁশি বাজতে প্রায় ৩০ মিনিট দেরি হয়। মেসির ট্রেডমার্ক ১০ নম্বর জার্সির প্রতি সম্মান জানিয়ে ম্যাচের দশম মিনিটে দুই মিনিট খেলা বন্ধ রাখেন রেফারি। এ সময় খেলোয়াড়, অফিশিয়াল থেকে শুরু করে গ্যালারির দর্শকেরা দুই মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে সমস্বরে করতালি এবং ‘ ওলে ওলে মেসি ’ স্লোগানে মহাতারকাকে অভিবাদন জানান। মাঠে থাকা বেনিনের ফুটবলাররাও মেসির সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাকে সম্মান জানান। স্টেডিয়ামজুড়ে এ সময় ফুটিয়ে তোলা হয় আতশবাজির ঝলকানি। খেলার শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণে আধিপত্য বিস্তার করে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৭ মিনিটে এনসো ফার্নান্দেস ও লিওনেল মেসির জোড়া শট রুখে দেন বেনিন গোলরক্ষক মার্সেল দান্দজিনু। প্রথমার্ধে বেশ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন মেসি ও লাউতারো মার্তিনেসরা। ২৪ মিনিটে রদ্রিগো ডি পলের থ্রু বল থেকে মেসির শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ২৬ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে মেসির বাঁ পায়ের জোরালো শট আবারও গ্লাভসবন্দি করেন বেনিনের গোলরক্ষক। অন্যদিকে বেনিনও কাউন্টার অ্যাটাকে বেশ কয়েকবার আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। গোলশূন্য প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে নিকোলাস ওতামেন্দি হলুদ কার্ড দেখেন। সেই ওতামেন্দিই বিরতির পর এগিয়ে দেন আর্জেন্টিনাকে। ৪৮ মিনিটে কর্নার থেকে বল পান লিওনেল মেসি। তার নিখুঁত ক্রসে ডি-বক্সের খুব কাছ থেকে ডান পায়ের জোরালো শটে বল জালে পাঠান এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় গোলেও ছিল মেসির অবদান। ম্যাচের ৬১ মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে মেসির নিখুঁত পাস পেয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত এক শটে বল সরাসরি জালে পাঠান তার ১০ নম্বর জার্সির সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী নিকো পাজ। ম্যাচের শেষ দিকে এসে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে আলবিসেলেস্তেরা। ৬৮ মিনিটে বেনিনের ডিফেন্ডার তামিমাউ উওরো ডি-বক্সের ভেতর ফাউল করলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি স্পট থেকে বাঁ পায়ের শটে স্কোরলাইন ৩-০ করে গোল উৎসবে মেতে ওঠেন খোদ লিওনেল মেসি। এসময় এনসো ফার্নান্দেস, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও লাউতারো মার্টিনেসের বদলি হিসেবে এক্সকুয়েল পালাসিওস, জিওভানি লো সেলসো এবং দুই তরুণ সেনসেশন — ফ্রাঙ্কো মাস্তান্তুনো ও লিওনেল ফ্লোরেসকে মাঠে নামান আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। ৭৪ মিনিটে মেসির একটি শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ম্যাচের শেষদিকে গোলের একাধিক সুযোগ তৈরি করে আলবিসেলেস্তেরা। তবে বেনিনের গোলরক্ষক সাতুর্নি আম্লাগের দক্ষতায় আর লক্ষ্যভেদ করা হয়নি। যোগ করা সময়ের ৯৫ মিনিটে ডি-বক্সের বাইরে থেকে একটি সরাসরি ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। বলের পেছনে দাঁড়ান স্বয়ং লিওনেল মেসি। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। বাঁ পায়ের সেই চিরচেনা শটে বল উড়িয়ে মারেন মেসি, কিন্তু বল ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে চলে যায়। আর ঠিক এর পরপরই ম্যাচ শেষের শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি। শেষ হয় মেসির বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।