রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন উত্তরার বাসিন্দা ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম)। ২০২২ সালে কৌতূহলবশত অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে মাঝেমধ্যে খেললেও ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়েন।
কখনো লাভ, কখনো লোকসান—এভাবেই চলছিল। ২০২৫ সালে একবার মাত্র ১০ হাজার টাকা লাগিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা জেতেন ফরহাদ। এরপর আরও লাভের আশায় খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা হারান।
ফরহাদ বলেন, "এক বন্ধুকে দেখে অনলাইনে জুয়া খেলা শুরু করি। প্রথম দিকে ১০০, ২০০ বা ৫০০ টাকা করে ডিপোজিট করে খেলতাম। বেশিরভাগ সময়ই হারতাম। একদিন ১ হাজার টাকা লাগিয়ে ৫ হাজার টাকা পাই। পরদিন ২ হাজার টাকা লাগিয়ে ১০ হাজার টাকা পাই। এতেই লোভ পেয়ে বসে। এরপর কখনো লাভ, কখনো লোকসান হতো।"
"গত বছর একদিন ১০ হাজার টাকা লাগিয়ে প্রায় ৬ লাখ টাকা লাভ হয়। সেই টাকার অর্ধেক তুলে ধারদেনা শোধ করি এবং একটি মোটরসাইকেল কিনি। এরপর আরও লাভের আশায় বাকি টাকা দিয়ে খেলতে থাকি। কিন্তু আর লাভ হয়নি। বরং সেই ৩ লাখ টাকাও শেষ হয়ে যায়। হারানো টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় আবার ধার করে খেলি। এভাবে আরও প্রায় ৬ লাখ টাকা হারাই," যোগ করেন তিনি।
এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ১০ লাখ টাকা হারানোর পর নিজের ভুল বুঝতে পারেন ফরহাদ। পরে তিনি জুয়ার আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। ফরহাদ বেরিয়ে আসতে পারলেও দেশে অনলাইন জুয়া শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, যা অনেক মানুষকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে অনলাইন জুয়া আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে আসক্ত, যাদের ৩৮ শতাংশ তরুণ ও যুবক।
সমীক্ষায় বলা হয়েছে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সাল নাগাদ এতে আসক্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে।
চার ধাপে বিদেশে পাচার হয় জুয়ার টাকা
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার টাকা চার ধাপে হাতবদল হয়ে বিদেশে পাচার হয়। প্রথম ধাপে থাকে জুয়াড়ি, দ্বিতীয় ধাপে স্থানীয় এজেন্ট, তৃতীয় ধাপে সুপার এজেন্ট এবং শেষ ধাপে থাকে মূল হোতা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে অনেকে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েন। অনলাইন জুয়ার অ্যাপ ও ওয়েবসাইটগুলোতে সাধারণত স্লট, ফিশিং ও লাইভ ক্যাসিনো—এই তিন ধরনের জুয়া খেলার সুযোগ থাকে।
খেলা শুরুর আগে জুয়ার অ্যাকাউন্টে অর্থ বা 'বেট মানি' যোগ করতে হয়। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে এই অর্থ জমা দেওয়া যায়। জুয়াড়ি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে দেওয়া এমএফএস নম্বরে টাকা পাঠালে তা তার জুয়ার অ্যাকাউন্টে যুক্ত হয়। খেলায় হারলে সেই অর্থ চলে যায়, আর জিতলে একই ধরনের ব্যবস্থায় অর্থ ফেরত আসে।
জুয়াড়িদের পাঠানো ছোট ছোট অঙ্কের অর্থ প্রথমে যায় স্থানীয় এজেন্টদের এমএফএস অ্যাকাউন্টে। এসব স্থানীয় এজেন্ট সাধারণত একে অপরকে চেনেন না। জুয়ার অ্যাপেই এজেন্ট নিয়োগের ব্যবস্থা থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর ও গ্রেপ্তার এড়াতে এজেন্টদের ব্যবহৃত নম্বরও নিয়মিত পরিবর্তন করা হয়।
এজেন্টরা টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। স্থানীয় এজেন্টরা জুয়াড়িদের কাছ থেকে আসা অর্থ একত্র করে সুপার এজেন্টদের এমএফএস বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠান। এর বিনিময়ে তারা শূন্য দশমিক ৪ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পান।
সিআইডি বলছে, সুপার এজেন্টরা সাধারণত প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ। তারাই জুয়ার সাইট পরিচালনার পাশাপাশি ডিজিটাল হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে জুয়ার অর্থ বিদেশে পাচার করেন। পরে সেই অর্থ পৌঁছে যায় অনলাইন জুয়ার মূল হোতাদের কাছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "চার ধাপে অনলাইন জুয়ার টাকা বিদেশে পাচার করা হয়। স্থানীয় এজেন্টরা কমিশনের বিনিময়ে এই টাকা পাচারে সহযোগিতা করে। এসব এজেন্টকে আইনের আওতায় আনতে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) নিয়মিত মনিটরিং করছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করছে।"
এজেন্টরা গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে মোট ১১৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাদের বিরুদ্ধে ১২টি মামলা করা হয়েছে। এরই মধ্যে ৮৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ গত সোমবার রাজধানীর রামপুরা থেকে সজীব দে (৩৭) ও মো. মাসুদ রানা (৩০) নামে দুই এজেন্টকে গ্রেপ্তার করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি)।
এদিকে গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে 'জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬' পাস হওয়ার পর এই আইনে ১১টি মামলায় ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ-দক্ষিণ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন।
তবে দুই সংস্থার হাতে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মূলত স্থানীয় এজেন্ট বা সুপার এজেন্ট। সংস্থা দুটির কর্মকর্তারা বলছেন, অনলাইন জুয়ার মূল হোতারা দেশের বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করায় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। এমনকি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের শনাক্ত করাও কঠিন। কারণ স্থানীয় বা সুপার এজেন্টদের সঙ্গে মূল হোতাদের সরাসরি পরিচয় থাকে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, মূল হোতারা সাধারণত চীন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব জুয়ার সাইট বা অ্যাপ পরিচালনা করেন।
এ বিষয়ে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের (দক্ষিণ) মো. তরিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "অনলাইন জুয়া সাইবার ক্রাইমের অনেক ধরনের অপরাধের মধ্যে একটি। সাইবার ক্রাইমের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকে অনলাইন জুয়া খেলা যায় এবং যেকোনো জায়গা থেকে এটি পরিচালনাও করা যায়। এটি ভার্চুয়াল জগতে সংঘটিত হয়। সুতরাং এর ওপর আমাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই।"
অনলাইন জুয়া বিস্তারের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্বল্প সময়ে অল্প টাকা বিনিয়োগ করে অনেক টাকা আয় করা সম্ভব—এমন একটি ধারণা মানুষের মধ্যে কাজ করে। এ থেকেই এক ধরনের আসক্তি তৈরি হয়, যা অনলাইন জুয়া বিস্তারের অন্যতম কারণ।
তিনি আরও বলেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত। তারা এর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে তা দেশের বাইরে পাচার করছে। এসব চক্রের কর্মকাণ্ডের কারণেও অনলাইন জুয়া পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
তবে অভিযানের ফলে অনলাইন জুয়া অনেকটা কমেছে বলে দাবি করেন এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, "আমরা অভিযান চালানোর পর অনলাইন জুয়া অনেক কমে এসেছে। আমরা অনেকগুলো সার্ভার ও কিছু অ্যাপ বন্ধ করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকও কিছু অ্যাপ্লিকেশনের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করছে।"
বাজারের আকার ৬৮ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার প্রায় ৬২ থেকে ৬৮ মিলিয়ন ডলার। এই বাজার প্রতিবছর ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়ছে।
চলতি বছরের ১৫ জুলাই প্রকাশিত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬ হাজার ২২২টি ব্যাংক ও এমএফএস অ্যাকাউন্টে মোট ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা জমা হয়েছে। একই সময়ে এসব অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলন করা হয়েছে ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ৮৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) ও সন্দেহজনক কার্যক্রম প্রতিবেদন (এসএআর) পেয়েছে বিএফআইইউ।