সুন্দরবনকে কাছ থেকে উপভোগ করার অন্যতম স্থান কয়রা উপজেলা। এটি খুলনা জেলার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। ১৭৭৫.৪১ বর্গকিলোমিটার আয়তন নিয়ে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এক কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ট্যুরিজম বোর্ডের সেই উদ্যোগ।
এই কয়রা উপজেলার একটি গ্রাম তেঁতুলতলার চর। এই গ্রামের দৃশ্য যেন একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রের তৈরি মঞ্চ। এই তেঁতুলতলার চর উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। এর তিন পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কয়রা নদী। এখানে কান পাতলেই শোনা যায় হরেক পাখির কোলাহল, পশুর ডাক, কখনও আবার বাঘের গর্জন। রাস্তায় বের হলে দেখা মেলে বানর, হরিণসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী।
বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম নেতা রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দীঘি, খানজাহান আলী (র.)-এর অনুসারীদের মাজার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এই অঞ্চলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। বাংলার বারো ভুঁইয়ার অন্যতম নেতা রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দীঘি, খানজাহান আলী (র.)-এর অনুসারীদের মাজার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এই অঞ্চলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।
কয়রায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা দেখার সুযোগ; রয়েছে খানজাহান আলী (র.)-এর স্মৃতি বিজড়িত মসজিদসহ বহু প্রাচীন ঐতিহ্য। সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি অংশ কয়রা উপজেলার মধ্যে থাকলেও আজও গড়ে ওঠেনি কোনো পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। দেশের পর্যটন মানচিত্রে কয়রার অবস্থান এখনও যেন অনেকটাই আড়ালে। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের দিনের ভ্রমণ শেষে খুলনা শহর বা অন্য এলাকায় ফিরে যেতে হয়।
কয়রার সঙ্গে পাইকগাছার রাড়ুলির ঐতিহাসিক গুরুত্বও পর্যটন রুটে যুক্ত করা যেতে পারে। উপমহাদেশের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত রাড়ুলি এ অঞ্চলের পর্যটন পরিকল্পনায় আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, কয়রার কয়েকটি এলাকায় লোকালয়ের কাছ থেকেই সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করা যায়। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করেই নতুন একটি ইকোট্যুরিজম মডেল তৈরি করা সম্ভব। এতে অবহেলিত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলেও মন্তব্য তার।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কয়রার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদী, বন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। সেই জনপদে পর্যটন যদি পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলবে।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিনের ভাষ্য, ম্যানগ্রোভ বনভিত্তিক ইকোট্যুরিজম উপকূলীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে পর্যটন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করতে হবে এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কয়রায় পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। একই অর্থবছরে খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এক কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত জায়গাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ায় বন বিভাগের আপত্তিতে সেখানে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরে ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমতি নিয়ে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করে কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরের কেওড়াকাটা এলাকায় নির্ধারণ করা হয়। নতুন জায়গা পরিদর্শন ও নকশা তৈরির পরও প্রায় তিন বছর ধরে নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হয়নি।
কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনের ভাষ্য, স্থান পরিবর্তনজনিত জটিলতার কারণে সময় লেগেছে। নতুন স্থানে কাজ শুরু করে পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারের প্রথম বিলের কিছু অংশ এখনও বাকি রয়েছে। বিল ছাড় না পাওয়ায় ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখেছেন।