এক সদস্যের পরিচালনা পর্ষদ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছাড়াই চলছে দেশের আর্থিক খাতে আমানত ও ঋণের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ইসলামী ব্যাংক। কয়েক মাস ধরে এমন পরিস্থিতি চলায় ব্যাংকটির করপোরেট গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ঋণ অনুমোদন, ঋণ নবায়ন, ঋণসীমা বাড়ানো এবং বড় অঙ্কের আমদানি-রপ্তানি অর্থায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকটির করপোরেট বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বড় করপোরেট গ্রাহকদের ঋণসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়মিত প্রক্রিয়ায় এগোলেও চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। ঋণ নবায়ন, সীমা বাড়ানো, নতুন ঋণ সুবিধা এবং বড় অঙ্কের আমদানি-রপ্তানি অর্থায়নের মতো প্রস্তাবে উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইসলামী ব্যাংকের একজন ডিএমডি নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকটির সঙ্গে ব্যবসা করা গ্রাহকেরাও এখন পর্ষদ না থাকায় ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় ভালো করপোরেট প্রতিষ্ঠানে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সংকট তৈরি হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত এমডিকেও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে খুব সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
ব্যাংকটির মাধ্যমে এখনো কয়েকশ পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য এলসি খোলা ও চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থায়ন পাচ্ছে না। কেউ কেউ এলসি খুলতে গিয়ে বিলম্বের মুখে পড়ছেন। এতে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের ভালো গ্রাহকদের একটি অংশও ব্যবসায়িক ঝুঁকিতে পড়েছে।
দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, হাতাহাতি-ইটপাটকেল
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আবার আন্দোলনে সক্রিয় হয়েছেন এস আলমের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালে চট্টগ্রামের পটিয়া অঞ্চল থেকে নিয়োগ পাওয়া ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মীরা।
অন্যদিকে চাকরিচ্যুতদের 'এস আলমের গং' ও ইসলামী ব্যাংক নিয়ে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করছে 'গ্রাহক ফোরাম' নামে একটি সংগঠন। যদিও সংগঠনটির অধিকাংশ সদস্য ব্যাংকের গ্রাহক হওয়ার পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক বলে জানা গেছে।
গত দুই দিনে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি হাতাহাতি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ পর্যন্ত গড়িয়েছে। গতকাল সোমবার দুই পক্ষের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে উভয় পক্ষের নেতারা জানিয়েছেন।
চাকরিচ্যুতদের পুনর্বহাল ও নতুন পর্ষদ গঠনের দাবিতে দুই পক্ষ মাঠে কর্মসূচি দিলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা বলেন, সমস্যার সমাধান মাঠের কর্মসূচিতে নেই।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংক দেখছে। বিষয়টি আদালতেও রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, নতুন পর্ষদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে থাকলেও এখনো যোগ্য ব্যক্তিদের খোঁজা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে ইসলামী ব্যাংকে স্থিতিশীলতা দরকার। একই সঙ্গে দুই শীর্ষ রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এর সমাধান করাই সহজ উপায় বলে মনে করেন তিনি।
তিন মাসের বেশি শূন্য এমডির পদ, আটকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মেয়াদ
ইসলামী ব্যাংকের নিয়মিত এমডির পদ প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে শূন্য। এর আগে ব্যাংকটির এমডি ছিলেন ওমর ফারুক খান। গত ১৩ এপ্রিল তৎকালীন পর্ষদ তাকে ছুটিতে পাঠায়। ছুটি শেষ হলেও তিনি ব্যাংকে যোগ দিতে পারেননি। পরে তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর আর নিয়মিত এমডি নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ভারপ্রাপ্ত এমডি দিয়ে ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম চলছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, এমডির পদ দীর্ঘ সময় শূন্য রাখার সুযোগ নেই। কোনো ব্যাংকে এমডির পদ শূন্য হলে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তি এমডির সার্বিক দায়িত্ব পালনে দায়বদ্ধ থাকেন। তবে এমডির পদ তিন মাসের বেশি শূন্য রাখা যাবে না। এর বেশি সময় শূন্য থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, "তিন মাসের বেশি এমডির পদ শূন্য রাখার নিয়ম নেই। পদটি শূন্য থাকলে প্রশাসক নিয়োগের বিধান রয়েছে। তবে যৌক্তিক কারণ থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময় বাড়াতে পারে। আর এখন যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন, তাই প্রশাসক নিয়োগ করা ঠিক হবে না।"
এদিকে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর চালু করা নিয়মের কারণে ব্যাংকটির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা চুক্তিভিত্তিকভাবে কর্মরত রয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডিসহ আট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও আটকে আছে।
সরকারি চাকরিবিধি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, নিয়মিত চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর এবং ৬৫ বছর পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত থাকা যায়। তবে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান করা হয়। এতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগের বিষয়টি পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ওই ব্যবস্থা বহাল থাকায় একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ শেষ হওয়া কর্মকর্তারা পুনর্নিয়োগের আবেদন করলেও তাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের তিন কর্মকর্তার চাকরির মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদারের চাকরির মেয়াদ গত ১১ সেপ্টেম্বর এবং উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব আলম ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট আমিনুর রহমানের চাকরির মেয়াদ ৯ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছে। তবে তাদের পুনর্নিয়োগের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ব্যাংক সূত্র জানায়, আট কর্মকর্তাকে পুনর্নিয়োগের জন্য ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকটি। এসব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগে পর্ষদের অনুমোদনই যথেষ্ট হলেও বর্তমান পরিস্থিতির কারণে বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে।
পর্ষদের দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. জহির হোসেন বলেন, ব্যাংকটির পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ নেই। তিনি পর্ষদের একটি অংশ মাত্র। এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ প্রয়োজন।
গত ১৪ জুন ইসলামী ব্যাংকের পুরো পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করে ব্যাংকটির পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জহির হোসেনকে। এরপর থেকে প্রায় তিন মাস ধরে ব্যাংকটির যাবতীয় সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তার ওপর রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারছেন না বলে ব্যাংকটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে পদত্যাগ করেন। ওই দিন রাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পর্ষদের দায়িত্ব নেওয়ার সময় জহির হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি সীমিত সময়ের জন্য এক সদস্যের পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছেন। ব্যাংকের কার্যক্রমে যেন বিঘ্ন না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনে যাচাই-বাছাই চলছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
ইসলামী ব্যাংকের নিরপেক্ষ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়ে তিনি বলেছিলেন, "পাঁচ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ জন্য যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। এমন নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে পর্ষদ গঠন করা হবে, যারা ব্যাংকটি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবেন।"
আমানত ও আয় কমেছে, খেলাপি ঋণ বেড়ে ৯৮,৯১৪ কোটি
ব্যাংকটির কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়। শীর্ষ কর্মকর্তারা এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করলে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়।
তবে নতুন পর্ষদ গঠনকে কেন্দ্র করে ব্যাংকে আবার অস্থিরতা শুরু হলে ব্যাপক হারে আমানত তুলে নেন গ্রাহকেরা। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তারল্য সহায়তা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যাংকটি।