শীঘ্রই দেশে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত 'ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন: পলিসি গোলস, ট্রানজেকশনস ইকোলজি অ্যান্ড সাসটেইনেবল রোডম্যাপ' শীর্ষক এক সংলাপে তিনি এ তথ্য জানান। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধি ও অংশীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'ডিজিটাল ব্যাংকিং খুব শীঘ্রই হতে যাচ্ছে। এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, কারণ এটি আমাদের ডিজিটাল অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান অংশ।'
তিনি জানান, ডিজিটাল ব্যাংকিং বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি মূল উপাদান হয়ে উঠবে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্রেডিট তথ্যের সঠিক সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে নীতি নির্ধারকরা পর্যায়ক্রমে এই সেবা চালুর পরিকল্পনা করছেন।
আর্থিক সেবার পরিসর বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ডিজিটাল ব্যাংকিংকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই; বরং নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল পেমেন্ট ও ব্যাংকিং সুবিধার সমন্বয়ে গঠিত একটি বিস্তৃত ইকোসিস্টেম হিসেবে এ ব্যবস্থাকে বিবেচনা করতে হবে।' এই সেবা বিস্তারের আগেই শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে থাকা নিম্ন আয়ের পরিবার, কৃষক ও প্রান্তিক মানুষকে ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মতো সরকারি সহায়তার অর্থ সরাসরি পাওয়ায় অনেক গৃহিণী নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলছেন। একইভাবে ফারমার্স কার্ডের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সুবিধা পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যেও অ্যাকাউন্ট খোলার আগ্রহ বাড়ছে।
তিনি বলেন, 'মানুষ যখন কোনো প্রথাগত ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ পায়, তখন ব্যাংকিং সিস্টেমে আসার ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের প্রণোদনা পায়।'
সংলাপ চলাকালে অংশগ্রহণকারীরা বাংলা কিউআরের অপব্যবহার এবং সর্বনিম্ন মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) ও ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি (আইআরএফ) তুলে নেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেন, যা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারীদের বিজনেস মডেলকে ব্যাহত করেছে। তারা জানান, চার্জমুক্ত পেমেন্ট সুবিধার সুযোগ নিয়ে কিছু এজেন্ট এমএফএসের টাকা ব্যাংকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে, যা বন্ধে কঠোর তদারকি দরকার।
এমডিআর হলো ডিজিটাল লেনদেন প্রক্রিয়ার জন্য মার্চেন্টদের পক্ষ থেকে ব্যাংক ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের দেওয়া ফি। আর আইআরএফ হলো এক ধরনের আন্তঃব্যাংক সার্ভিস চার্জ, যা বাংলা কিউআর স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে সেই প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়–যার অ্যাপ ব্যবহার করে পেমেন্ট করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, 'এমডিআর ও আইআরএফ শূন্য করা হলে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাশ-ইন চার্জ বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যকে ব্যাহত করবে।'
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'বাংলা কিউআর এমন একটি বিষয় যা আমাদের গ্রহণ করতেই হবে, তবে একই সাথে এর অপব্যবহার রোধ করতে হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, তবে একটি 'বিগ-ব্যাং' ধরনের সমাধান তৈরির জন্য অনেক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই উদ্যোগ টেকসই হতে হবে। এই সমস্যার একক কোনো সমাধান নেই, একটি একটি করে সমাধান করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'আমাদের সময়ে আমরা স্থানীয় সরকারগুলোকে পরামর্শ দিয়েছিলাম যেন ট্রেড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা বা নবায়ন করা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি কর্পোরেশন একটি বাংলা কিউআর সুবিধা থাকা বাধ্যতামূলক করে।'
তিনি জানান, নীতিটি এমনও ছিল যে, একটি একক জাতীয় কিউআর স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিত। সেটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহক যেন এটি ব্যবহার করতে পারে। তবে এটি গ্রাহকদের কাছে স্মার্টফোন থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত কি না সেই প্রশ্নও তোলে।
তিনি বলেন, 'ডিজিটাল ব্যাংক হলো আরেকটি খাত যা বর্তমানে আটকে আছে। আমি জানি না কেন। আমার সময়ে সবকিছুই করা হয়েছিল। তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, মানদণ্ড চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং প্রক্রিয়াটি সাজানো হয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকে এটি আর এগোয়নি।'
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, 'বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের জন্য একটি টেকসই রোডম্যাপ থাকতে হবে, যেখানে আজকের অংশীজনদের মতামত বড় আকারে বিবেচনায় নেওয়া হবে। স্পষ্টতই, এসব কাজ করতেই হবে, তবে ডিজিটাল ভবিষ্যতের বিভিন্ন অংশ জুড়ে আরও অনেক কাজও করতে হবে।'
তিনি বলেন, 'অংশীজনেরা পুরো প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও অবদান রাখতে আগ্রহী। এখন একটি টেকসই রোডম্যাপ পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। এর জন্য অনেক, অনেক বড় আলোচনার প্রয়োজন।'
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.