বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা স্থাপন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মঙ্গলবার জারি করা এক পরিপত্র অনুযায়ী, এ তহবিল থেকে দেওয়া ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১০ বছর। এর মধ্যে এক বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড।
গৃহস্থালি, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্প পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপন, সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়নে এ তহবিল থেকে ঋণ নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও নেট মিটারিং সংযোগ, সোলার হোম সিস্টেম, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, সৌরচালিত সেচ পাম্প এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইনভার্টার, মিটার ও ব্যাটারির জন্যও এ ঋণ ব্যবহার করা যাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে এ তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ও ভর্তুকির চাপ কমবে বলে আশা করছে সরকার।
জ্বালানি অর্থনীতিবিদ শফিকুল আলম কম সুদের এ তহবিল গঠনকে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে সরকার যে তহবিল গঠন করেছে, এ ধরনের তহবিল আগে ছিল না। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ঋণ বিতরণে ইডকল ও পিকেএসএফকে সম্পৃক্ত করায় পল্লী এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে আগ্রহীরাও ঋণসুবিধা পাবেন।"
তবে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য শুধু ঋণসুবিধা যথেষ্ট নাও হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
শফিকুল আলম বলেন, "বাংলাদেশে অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছেন। তাদের পক্ষে ঋণ নিয়ে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করা সহজ হবে না। এ ধরনের মানুষের জন্য সরকার ক্যাপিটাল সাবসিডি বা ক্যাপিটাল ইনসেনটিভ চালু করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। ভারতে এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।"
অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদও উদ্যোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তহবিলের সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "সাধারণভাবে এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সারা দেশে ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হলে খুব বেশি মানুষ বা প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা পাবে না। একজন সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ নিতে পারবেন, কাদের ঋণ দেওয়া হবে এবং কীভাবে তা মনিটরিং করা হবে—এসব বিষয় একটি নীতিমালার আওতায় কঠোরভাবে প্রতিপালন করা হলে সুফল পাওয়া যাবে।"
অন্যথায় এ অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি অনুবিভাগের যুগ্মসচিব আনারুল কবির স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরের বাজেটে এসএমই খাতের জন্য সংরক্ষিত ২ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ থেকে ১ হাজার কোটি টাকা এ তহবিলে দেওয়া হবে। বাকি ৫০০ কোটি টাকা সরকারের অপারেটিং লোন থেকে সংস্থান করা হবে।
১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনকে (পিকেএসএফ) ৫০০ কোটি টাকা করে ঋণ দেবে সরকার।
এই তিন প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া ঋণের সুদহার হবে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঋণচুক্তির ভিত্তিতে তারা এ অর্থ পাবে এবং সরাসরি অথবা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কাছে ঋণ বিতরণ করতে পারবে।
পরিপত্র অনুযায়ী, সুবিধাভোগী পর্যায়ে সব ধরনের ফি ও চার্জসহ কার্যকর বার্ষিক সুদের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ হবে। কোনো অবস্থাতেই এ সীমা অতিক্রম করা যাবে না।
ঋণের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১০ বছর। এর মধ্যে এক বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে।
এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ত্রৈমাসিক শেষে ঋণের অর্থে কত মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন হয়েছে, সুবিধাভোগীর সংখ্যা এবং ঋণ আদায়ের পরিস্থিতির তথ্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
এ ছাড়া অর্থবছর শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নিরীক্ষিত হিসাবসহ বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু বিধিনিষেধ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ ঋণের অর্থ দিয়ে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ বা লোন এভারগ্রিনিং, জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ, সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো কিংবা অন্য কোনো তহবিল বা কাজে অর্থ স্থানান্তর করা যাবে না।
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের আরও উদ্যোগ
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট ও আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তুলতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
এ লক্ষ্য অর্জনে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও এসব যন্ত্রপাতি তৈরির কাঁচামাল আমদানিতেও বড় ধরনের করছাড় দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের (আইআরডি) ১৬ সেপ্টেম্বরের আদেশ অনুযায়ী, শিল্পে ব্যবহারের জন্য সোলারের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ২ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে এসব যন্ত্রপাতি ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি করা যাবে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যান্য বাণিজ্যিক আমদানিকারকেরাও দেশে উৎপাদিত কয়েকটি কম্পোনেন্ট ছাড়া সোলারের প্রায় সব যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি করতে পারবেন। এর আগে এসব পণ্যে আমদানি করের হার ২৩ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত ছিল।
পাশাপাশি বড় বিনিয়োগকারীদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে সরকার। গৃহস্থালি পর্যায়েও নেট মিটারিং ব্যবস্থা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নেট মিটারিংয়ের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কেনার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার।
তবে নতুন এ তহবিলের অর্থ দিয়ে বিদ্যমান ঋণ পরিশোধ বা ঋণ এভারগ্রিনিং, জমি বা শেয়ার কেনা, ব্যক্তিগত ভোগ বা সাধারণ প্রশাসনিক ব্যয় মেটানো কিংবা অন্য কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করা যাবে না।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.