জাতীয় লিগ, বিসিএল তথা বিসিবির ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় হওয়া আসরে ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি বৃদ্ধি এবং গড়পড়তা বাৎসরিক আয় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু যে আসর গড়পড়তা শ দেড়েক ক্রিকেটারের সারা বছরের ভরণপোষণের অন্যতম উৎস, সেই ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের পারিশ্রমিক যে কমছে, তা জানেন কজন? এবার মানে ২০২৭ সালের ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক কমার সম্ভাবনা যথেষ্ট।
এখন পর্যন্ত খবরটা সেভাবে ছড়ায়নি এখনো। যদিও জাগো নিউজের পাঠকরা ৪-৫ দিন আগেই জেনে গেছেন, এবার ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে অর্থ সংকট। বেশির ভাগ ক্লাবের কাছে টাকা নেই। থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম।
এদিকে ক্রিকেটারদের চাহিদা অনেক বেশি। প্রায় হাফডজন ক্রিকেটার ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা দর হাঁকিয়েছেন। তাদের সাথে রফা করতে ক্লাবগুলোর নাভিশ্বাস। জাতীয় পর্যায়ের একজন ক্রিকেটারের গড়পড়তা দর ৫০-৬০ লাখ টাকা। জাতীয় দলে অনিয়মিত এবং তার বাইরের ক্রিকেটারদের বড় অংশ দর হাঁকাচ্ছেন ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা।
গত কয়েকদিন ক্লাবপাড়ায় ঘুরে এ খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। কয়েকজন ক্লাব অফিসিয়ালের সাথে কথা বলে জানা গেল, তারা ক্রিকেটারদের উচ্চমূল্য দেখে চরম বিপাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্তা বলেই ফেলেছেন, এ বছর এমনিতেই আমাদের কাছে টাকা নেই। তার ওপর ক্রিকেটারদের ডিমান্ড বেশি। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের কেউ ৫০-৬০ লাখ টাকার নিচে কথাই বলতে চাচ্ছেন না।
জাতীয় দলে অনিয়মিত ও আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকা ক্রিকেটারদের বড় অংশ ৪০ লাখ টাকার নিচে খেলতে রাজি হচ্ছেন না। এতে করে ক্লাবগুলোর বাজেট গত বছরের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। যার জোগান দিতে মোহামেডান, আবাহনীর মতো জনপ্রিয় ও বড় দল হিমশিম খাচ্ছে।
এর মধ্যে মোহামেডান কর্তারা এমনিতেই চাপে। তারা গতবারের পেমেন্টও পরিশোধ করতে পারেননি। বলার অপেক্ষা রাখে না, প্রায় দেড় যুগ (১৭ বছর) পর প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগের শিরোপা জিততে ২০২৬ সালে মোহামেডান স্মরণাতীতকালের মধ্যে সবচেয়ে ‘বিগ বাজেটের’ দল গড়েছিল।
কে ছিলেন না দলে? মুশফিকুর রহিম, তাওহীদ হৃদয়, এনামুল হক বিজয়, পারভেজ হোসেন ইমন, আফিফ হোসেন ধ্রুব, রিশাদ হোসেন, ইয়াসির আলী রাব্বি, মোহাম্মদ সাইফউদ্দীন, তাসকিন আহমেদ, নাহিদ রানা, এবাদত হোসেন ও তাইজুল ইসলামের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত জাতীয় তারকাকে দলে টেনে লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে সাদা-কালোরা। তাদের সাথে রিপন মন্ডল, মুশফিক হাসানের মতো ক্রিকেটারও ছিলেন মোহামেডানে। এতগুলো জাতীয় দলের ক্রিকেটারের পেমেন্ট, অনেক টাকার ব্যাপার।
ভেতরের খবর, তিন-তিনবার তারিখ দিয়েও মোহামেডান এখনো গত লিগের পুরোপুরি পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে পারেনি। এখন নতুন করে আগামী বছরের জন্য অগ্রিম দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন মোহামেডান ক্রিকেট কমিটি প্রধান মাসুদুজ্জামান।
জানা গেছে, মোহামেডানের ক্রিকেটারদের প্রায় ৭৫ শতাংশ পেমেন্ট একাই দিয়েছেন মাসুদুজ্জামান। মোহামেডান ক্রিকেট কমিটি চেয়ারম্যান মাসুদুজ্জামানের একার পক্ষে বিশাল অঙ্কের পাওনা পরিশোধ করাও বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহামেডানের পরিচালক পর্ষদের সদস্য সচিব লোকমান হোসেন আপ্রাণ চেষ্টা করছেন মাসুদুজ্জামানকে সহায়তা করতে। তিনিও এদিক-ওদিক থেকে অর্থ জোগাড় করে ক্রিকেটারদের পাওনা শোধে তৎপর। কিন্তু ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট আর কেউ সেভাবে অর্থ জোগান না দেওয়ায় বিপাকে লোকমান হোসেন ও মাসুদুজ্জামান।
গত লিগের পাওনা অর্থ আর আগামী লিগের অগ্রিম পেমেন্ট মিলে অন্তত ৫ থেকে ৬ কোটি টাকার মতো দরকার মোহামেডানের। সে বিপুল অর্থ সংগ্রহে ওই দুজন ছাড়া সে অর্থে ক্রিকেট কর্তাদের ভূমিকা নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত মোহামেডানের অবস্থা কী দাঁড়াবে? বলা কঠিন।
মোহামেডানের সর্বশেষ অবস্থা জানতে ক্লাবটির ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ও বিসিবি পরিচালক মাসুদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেছেন, তারা অর্থ সংকটে আছেন।
ক্লাবের গভর্নিং বডির সদস্য সচিব লোকমান হোসেনকে ধন্যবাদ দিয়ে মাসুদুজ্জামান জাগো নিউজকে জানান, লোকমান ভাই আমাকে সাহায্য করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু ক্রিকেট কমিটিতে আর কেউ সেভাবে অর্থ দিয়ে এগিয়ে না আসায় আমার একার ওপর অনেক চাপ পড়ে গেছে। তারপরও আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করছি মোহামেডানের সুনাম, ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে।
মাসুদুজ্জামানের কথায় পরিষ্কার আভাস, অর্থ জোগাড় না হলে শেষ পর্যন্ত আগামী বছর মোহামেডানের পক্ষে কাগজে-কলমে এক নম্বর দল গড়া সম্ভব নাও হতে পারে।
আবাহনীর অর্থনৈতিক অবস্থাও বিশেষ ভালো না। গত লিগে আবাহনীর হয়েও নাজমুল হোসেন শান্ত, সৌম্য সরকার, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, জিসান আলম, জাকের আলী অনিক, মাহিদুল ইসলাম অংকন, খালেদ আহমেদ, সাব্বির হোসেন, সাব্বির রহমান ও এসএম মেহরবের মতো প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটাররা খেলেছেন।
সেই দল ধরে রাখতে হলে আবাহনীকেও ৩ কোটি টাকার ওপরে গুনতে হবে। কাজেই আবাহনীর পক্ষেও আগেরবার দল ধরে রাখা কঠিন।
শুধু আবাহনী আর মোহামেডান নয়। ব্রাদার্স ইউনিয়ন, লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জও এবার অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের পক্ষেও ভালো দল গড়া কঠিন। এমনকি ঢাকা লেপার্ডসও এবার অর্থনৈতিক কারণে আগেরবারের দল ধরে রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্রিকেটারদের ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন প্রধান মোহাম্মদ মিঠুনসহ আরও কজন সিনিয়র ক্রিকেটার উদ্ভূত পরিস্থিতির ইতিবাচক সমাধানে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন।
জাগো নিউজের সাথে আলাপে কোয়াব সভাপতি মিঠুন আজ বৃহস্পতিবার জানান, আমরা সেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বসেই ক্লাব ক্রিকেটের অর্থ সংকট, মোহামেডানের বড় অঙ্কের পেমেন্ট বাকি এবং বেশ কটি দলের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া নিয়ে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করেছি। আমরা ক্লাব ও ক্রিকেটারদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। আমি তথা আমরা কোয়াব কর্তারা জানি, এবছর ক্লাবগুলোর অর্থ সংকট চলছে। তারা আগের মতো ক্রিকেটারদের ডিমান্ড ফুলফিল করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই আমরা মাঝামাঝি একটা অবস্থানে থেকে পরিস্থিতির ইতিবাচক সমাধানের চেষ্টা করছি। যাতে ক্লাবের ওপরও বাড়তি চাপ না পড়ে আবার ক্রিকেটাররাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই উপায় খোঁজার চেষ্টা করছি।
কী সেই উপায়? জানা গেছে, মোহাম্মদ মিঠুন ক্লাবগুলো ও ক্রিকেটারদের সাথে বসে একটা প্রস্তাব দিতে চান, সেটা হলো এবার পেমেন্ট হবে ম্যাচপিছু। ক্লাবগুলো ক্রিকেটারদের সাথে চুক্তি করবে ম্যাচপিছু। এবং একটা ক্যাটাগরি তৈরি হবে।
‘এ প্লাস’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের জন্য ম্যাচপিছু ৪ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকার প্রস্তাব দেওয়া হবে। তাতে রবিন লিগ ও সুপার লিগ মিলে ১৬ ম্যাচে একজন ‘এ প্লাস’ ক্যাটাগরির একজন ক্রিকেটার পাবেন ৬৪ লাখ টাকা। বলে রাখা ভালো, এই ক্যাটাগরির ক্রিকেটাররা হড়হড় করে এবার ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি দর হাঁকাচ্ছেন। তাদের গড়পড়তা পারিশ্রমিক তখন ৬০-৬৪ লাখে নেমে আসবে।
একইভাবে ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের ম্যাচপিছু ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব আসতে পারে। তাতে করে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোনো ক্রিকেটার ১৬ ম্যাচ খেলতে পারলে পাবেন ৪৮ লাখ টাকা।
একইভাবে ‘বি’ ক্যাটাগরি ম্যাচপিছু আড়াই লাখ এবং সি ক্যাটাগরি প্রতি ম্যাচ ২ লাখ টাকা করে পাবেন। সেক্ষেত্রে ‘বি’ ক্যাটাগরির কোনো ক্রিকেটার সব ম্যাচ খেললে ৪০ লাখ টাকা আর সি ক্যাটাগরির ক্রিকেটার সব ম্যাচ অংশ নিলে পাবেন ৩২ লাখ টাকা।
এভাবেই আনুপাতিক হারে ‘ডি’ ও ‘ই’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারদের ম্যাচপিছু পারিশ্রমিক নির্ধারণের কথা ভাবা হচ্ছে। তাতে করে ক্লাব ও ক্রিকেটার; উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে ধারণা কোয়াব প্রধান মিঠুনের।