দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা। গত ১৭ আগস্ট রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এই কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কোনো প্রকার তাড়াহুড়ো না করে বরং সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে এবং সম্মানজনক আমন্ত্রণ প্রস্তাবের ভিত্তিতেই কেবল শীর্ষ পর্যায়ের এই সফর বাস্তবায়িত হতে পারে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনের আগে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে নানা জল্পনা-কল্পনা ও অনুমাননির্ভর সংবাদ প্রচারিত হলেও বাংলাদেশ জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অগ্রগতি এবং সরকারপ্রধানের শীর্ষ পর্যায়ের সফরের বিষয়টি ভারতের বর্তমান নেতৃত্বের মানসিকতা বা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ মানুষের জনসমর্থন নিয়ে গঠিত নতুন সরকারের সাথে ভারত ঠিক কী ধরনের সম্পর্কের ভিত্তি রচনা করতে চায়, তা স্পষ্টভাবে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। উভয় দেশের পারস্পরিক ঐকমত্য এবং সম্মানজনক পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আসন্ন সম্মেলনের আগে এই সফরের সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত।
সাক্ষাৎকারে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যুও উঠে আসে। বাংলাদেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামিদের নির্দিষ্ট কিছু দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বা প্রচারমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ প্রদানকে গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর এ ধরনের অপতৎপরতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নিয়ম এবং আইনি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই বিষয়ে ইতিমধ্যে যথাযথ কূটনৈতিক প্রতিবাদলিপির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের তৎপরতা রোধে কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা বাংলাদেশ প্রথম নীতি অনুসরণ করে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখছে। অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিস্তার ঘটানোর অংশ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাথে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়ে উচ্চপর্যায়ের সরকারি সফর চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি পাকিস্তানের সাথে প্রথাগত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং জনগণের সাথে জনগণের যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়টিও সক্রিয় রয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগেও দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যিক পরিসর বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সুনির্দিষ্ট অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে, চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের সাথে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মেলবন্ধন দৃঢ় করা এবং রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ানোর বিষয়েও বিশেষ কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সাফল্য ও প্রভাবের কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সমর্থন লাভ করেছে। এই আন্তর্জাতিক আস্থাকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকান দেশগুলোর সাথে নতুন বাণিজ্য বাজার উন্মোচন, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং এবং পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টির লক্ষ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর ক্ষেত্রে উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ইতিবাচক আলোচনার ফলে সৃষ্ট জটিলতার অবসান ঘটতে চলেছে, যার ফলে খুব শীঘ্রই বাংলাদেশি কর্মীদের পুনরায় মালয়েশিয়ায় গমনের পথ উন্মুক্ত হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর কূটনৈতিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টির প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।