অস্কারজয়ী আইরিশ সংগীতশিল্পী গ্লেন হ্যানসার্ড মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। বুধবার ভোরে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে তার মৃত্যু হয়।
মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।
তার ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান এটিসি ম্যানেজমেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ডাবলিনে সড়ক দুর্ঘটনায় গ্লেন হ্যানসার্ড মারা গেছেন। আইরিশ পুলিশ জানিয়েছে, ডাবলিনের পশ্চিমাঞ্চলে একটি মোটরসাইকেলের একক দুর্ঘটনায় পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি মারা গেছেন। স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ৪টার কিছু আগে জরুরি সেবাকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
সেখানে চিকিৎসা দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। গ্লেন হ্যানসার্ড ছিলেন আইরিশ সংগীতজগতের অন্যতম পরিচিত মুখ। ২০০৮ সালে স্বাধীনধারার সিনেমা ‘ওয়ান্স’–এর জন্য ‘সেরা মৌলিক গান’ বিভাগে অস্কার জয় করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ‘দ্য ফ্রেমস’-এর প্রধান কণ্ঠশিল্পী ছিলেন।
তার মৃত্যুতে সংগীত জগতের বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ শোক প্রকাশ করেছেন। বিখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন বলেন, তিনি এবং তার ব্যান্ড একজন ‘দারুণ সংগীতশিল্পী, ভালো বন্ধু এবং উদার ও ভদ্র মানুষকে’ হারিয়ে গভীরভাবে শোকাহত। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন বলেন, হ্যানসার্ড এমন একজন শিল্পী ছিলেন, যিনি আয়ারল্যান্ডের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
গ্লেন হ্যানসার্ড মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে দেন। এরপর নিজের শহর ডাবলিনের রাস্তায় গান গেয়ে জীবিকা শুরু করেন।
১৯৯০ সালে তিনি গঠন করেন রক ব্যান্ড ‘দ্য ফ্রেমস’। নিজ দেশে ব্যান্ডটির জনপ্রিয়তা তাকে ধীরে ধীরে আইরিশ সংগীতের অন্যতম পরিচিত শিল্পীতে পরিণত করে। পরে তিনি একক শিল্পী হিসেবেও বেশ কয়েকটি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। ২০১৬ সালে তার কাজ গ্র্যামি পুরস্কারের মনোনয়ন পায়। তিনি অস্কারজয়ী শিল্পী মার্কেটা ইরগ্লোভার সঙ্গে ‘দ্য সোয়েল সিজন’ নামের সংগীত জুটির সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।
স্বল্প বাজেটের সিনেমা ‘ওয়ান্স’-এ গ্লেন হ্যানসার্ড ও মার্কেটা ইরগলোভা অভিনয় করেন। সিনেমাটিতে একজন পথশিল্পী এবং এক তরুণ চেক অভিবাসী নারীর সম্পর্কের গল্প তুলে ধরা হয়। এই সিনেমায় তাদের গাওয়া গান ‘ফলিং স্লোলি’ বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পায় এবং ২০০৮ সালে অস্কার জয় করে। সিনেমাটির গানগুলো পরে ব্রডওয়ের জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে রূপ নেয়। ২০১২ সালে সেই মঞ্চনাটক আটটি টনি পুরস্কার জেতে। অস্কার গ্রহণের সময় আবেগাপ্লুত হ্যানসার্ড উপস্থাপক জন ট্র্যাভোল্টার হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে কী করছি? এটা তো অবিশ্বাস্য।’ ‘ওয়ান্স’-এর আগে তার অভিনয়ের অভিজ্ঞতা ছিল ১৯৯১ সালের জনপ্রিয় সিনেমা ‘দ্য কমিটমেন্টস’-এ। সেখানে তিনি একটি ব্যান্ডের সদস্যের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সংগীতের পাশাপাশি সামাজিক কাজেও সক্রিয় ছিলেন গ্লেন হ্যানসার্ড।
গৃহহীন মানুষের সহায়তায় তার ভূমিকার জন্য তিনি প্রশংসিত ছিলেন। ২০১০ সালে আয়ারল্যান্ডের অর্থনৈতিক সংকটের সময় বড়দিনের আগের রাতে তিনি ডাবলিনে পথসংগীতের একটি আয়োজন শুরু করেন। পরে এই আয়োজন থেকে ডাবলিন সাইমন কমিউনিটি নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ লাখ ইউরোর বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বুধবার তাকে ‘গৃহহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক মহীরুহ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ডাবলিনের কেন্দ্রে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে বোনো, সিনেড ও’কনর, শেন ম্যাকগোয়ান -এর মতো শিল্পীরা অংশ নিয়েছেন। ২০২৩ সালে বন্ধু শেন ম্যাকগোয়ানের শেষকৃত্যে গ্লেন হ্যানসার্ড ‘দ্য পোগস’-এর জনপ্রিয় বড়দিনের গান ‘ফেয়ারিটেল অব নিউ ইয়র্ক’ পরিবেশনায় নেতৃত্ব দেন।
‘ইউ টু’ ব্যান্ডের প্রধান কণ্ঠশিল্পী বোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হ্যানসার্ডকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি প্রয়োজনে সব সময় হাসিমুখে পাশে দাঁড়াতেন। বোনো বলেন, হ্যানসার্ড কখনোই রাস্তায় থাকা কোনো মানুষকে সাহায্য না করে পাশ কাটিয়ে যেতেন না। তিনি তাকে ‘রাস্তাঘাটের কণ্ঠস্বর’ বলেও উল্লেখ করেন। গ্লেন হ্যানসার্ডের স্ত্রী মাইরে সারিটসা এবং তাদের তিন বছর বয়সী ছেলে ক্রিস্টি রয়েছেন।