ফুটবল মাঠে নেমেছিলেন জয়ের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু একটি সংঘর্ষই কেড়ে নিল জীবন। প্রতিপক্ষ গোলরক্ষকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে মারা গেছেন স্প্যানিশ ফুটবলার হেসুস দে মিগেল। মাত্র ৩০ বছর বয়সে তেনেরিফের এই স্ট্রাইকারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমেছে ফুটবল বিশ্বে।
তবে এমন মর্মান্তিক ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও ম্যাচ চলাকালে কিংবা মাঠে অসুস্থ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কয়েকজন ফুটবলার। কারও মৃত্যু হয়েছে হৃদ্রোগে, কেউ আবার গোল করতে গিয়ে সংঘর্ষের শিকার হয়েছেন। ফুটবল ইতিহাসের তেমনই পাঁচটি ঘটনা ফিরে দেখা যাক।
মার্ক-ভিভিয়েন ফোয়ে (ক্যামেরুন, জুন ২০০৩)
২০০৩ সালের ২৬ জুন। ফ্রান্সের লিওঁতে কনফেডারেশনস কাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি ক্যামেরুন ও কলম্বিয়া। ম্যাচের ৭১ মিনিটে হঠাৎ মাঠে লুটিয়ে পড়েন ক্যামেরুনের মিডফিল্ডার মার্ক-ভিভিয়েন ফোয়ে। আশপাশে প্রতিপক্ষের কোনো খেলোয়াড়ও ছিলেন না। কারও সঙ্গে সংঘর্ষ ছাড়াই মাটিতে পড়ে যান তিনি।
দ্রুত মাঠে ছুটে আসেন চিকিৎসকেরা। তাকে মাঠের বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে হৃদ্স্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে মারা যান ক্যামেরুনের এই ফুটবলার।
ফোয়ে তখন ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে ধারে খেলছিলেন। এর আগে ওয়েস্ট হাম ইউনাইটেড, লিওঁ ও লাঁসের হয়েও খেলেছেন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দল দুই জায়গাতেই পরিচিত মুখ ছিলেন এই মিডফিল্ডার।
ফোয়ের মৃত্যুর খবর জানার আগেই কলম্বিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে উঠেছিল ক্যামেরুন। পরে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ জার্সি পরে মাঠে নামেন দুই দলের ফুটবলাররা।
ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র (ব্রাজিল, ডিসেম্বর ২০০৪)
গোল করে দলকে শিরোপা জেতানোর আনন্দের মুহূর্তেই নেমে এসেছিল মৃত্যুর ছায়া। ২০০৪ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের বেঙ্গালুরুতে ফেডারেশন কাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ডেম্পো স্পোর্টস ক্লাব ও মোহনবাগান।
ম্যাচে ডেম্পোর হয়ে প্রথম গোলটি করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার ক্রিস্তিয়ানো জুনিয়র। এরপর ৭৮ মিনিটে আরও একটি গোল করেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় গোল করার সময় মোহনবাগানের গোলরক্ষক সুব্রত পালের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তার।
গোল করার পর কিছুটা এগিয়েই মাঠে লুটিয়ে পড়েন জুনিয়র। সতীর্থ ও চিকিৎসাকর্মীরা দ্রুত তার কাছে ছুটে আসেন। নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার র্যান্টি মার্টিন্সও অসুস্থ সতীর্থের পাশে ছিলেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মাত্র ২৫ বছর বয়সে থেমে যায় এই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের জীবন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়, ম্যাচটি ২-০ গোলে জিতেছিল ডেম্পো। দুটি গোলই করেছিলেন জুনিয়র। অথচ শিরোপা জয়ের আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ হয়নি তার।
আন্তোনিও পুয়ের্তা (স্পেন, আগস্ট ২০০৭)
স্প্যানিশ ক্লাব সেভিয়ার হয়ে তখন দুর্দান্ত সময় কাটাচ্ছিলেন আন্তোনিও পুয়ের্তা। মাত্র তিন মাস আগেই ক্লাবকে উয়েফা কাপ জিততে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ২৫ আগস্ট গেতাফের বিপক্ষে লা লিগার ম্যাচে ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা।
ম্যাচের ৩৫ মিনিটে হঠাৎ মাঠে পড়ে যান পুয়ের্তা। সতীর্থ ও চিকিৎসকেরা দ্রুত এগিয়ে আসেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরে পান তিনি। এমনকি নিজে হেঁটেই মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে যান। কিন্তু বিপদ তখনও কাটেনি। ড্রেসিংরুমে আবারও হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হন তিনি। অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
টানা তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর ২৮ আগস্ট মারা যান ২২ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ ফুটবলার। দীর্ঘ সময় হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ থাকার প্রভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি ও একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তার মৃত্যু হয়েছিল।
ফিল ও'ডনেল (স্কটল্যান্ড, ডিসেম্বর ২০০৭)
একই বছরের শেষ দিকে আরও একটি মর্মান্তিক মৃত্যু দেখেছিল ফুটবল বিশ্ব। ২০০৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর স্কটিশ প্রিমিয়ার লিগে ডান্ডি ইউনাইটেডের বিপক্ষে খেলছিল মাদারওয়েল। দলের অধিনায়ক ছিলেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ফিল ও'ডনেল।
ম্যাচের শেষ দিকে তাকে বদলি করার প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু মাঠ ছাড়ার আগেই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যান ও'ডনেল। চিকিৎসকেরা মাঠে প্রায় পাঁচ মিনিট চিকিৎসা দেন তাকে। এরপর স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।
৩৫ বছর বয়সী এই ফুটবলার হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় মারা গিয়েছিলেন। মাদারওয়েল সেই ম্যাচে ৫-৩ গোলে জিতেছিল। কিন্তু অধিনায়কের মৃত্যুর খবরে জয় অর্থহীন হয়ে পড়ে।
হুয়ান ইসকিয়েরদো (উরুগুয়ে, আগস্ট ২০২৪)
দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব ফুটবলও এমন এক মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে মাত্র দুই বছর আগে। ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট কোপা লিবার্তাদোরেসের শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রাজিলের সাও পাওলোর বিপক্ষে খেলছিল উরুগুয়ের ক্লাব নাসিওনাল।
ম্যাচের ৮৪ মিনিটে হঠাৎ মাঠে লুটিয়ে পড়েন নাসিওনালের ডিফেন্ডার হুয়ান ইসকিয়েরদো। তার সঙ্গেও প্রতিপক্ষের কোনো সংঘর্ষ হয়নি। দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষায় হৃদ্স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা বা কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া ধরা পড়ে। পরে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার জটিলতায় মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হারান তিনি।
হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৭ আগস্ট মারা যান ২৭ বছর বয়সী এই উরুগুইয়ান ফুটবলার। তার মৃত্যুর ঘটনাটি আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে পারিবারিক কারণে। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেই দ্বিতীয় সন্তানের বাবা হয়েছিলেন ইসকিয়েরদো। স্ত্রী, দুই বছর বয়সী মেয়ে ও সদ্যোজাত ছেলেকে রেখে চলে যান তিনি।