মেক্সিকোর শতাব্দীপ্রাচীন ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের স্মরণ উৎসবের ঐতিহ্যবাহী উদ্যাপনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জেমস বন্ডের সিনেমা। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্পেক্টর’ সিনেমার একটি দৃশ্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মেক্সিকো সিটিতে শুরু হয়েছিল এই বর্ণাঢ্য প্যারেড। স্থানীয় সময় শনিবার (৩১ অক্টােবর) আয়োজনটির দশম বার্ষিকীতে বিশাল কঙ্কাল, সুসজ্জিত গাড়ি ও বিচিত্র পোশাকে সজ্জিত শিল্পীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর রাজপথ। খবর এএফপির।
‘ডে অব দ্য ডেড’ মেক্সিকোর একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। প্রাক-কলম্বীয় সংস্কৃতি ও খ্রিষ্টীয় ‘অল সেইন্টস ডে’র ঐতিহ্যের মিশেলে এদিন প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ করেন দেশটির মানুষ। সাধারণত পরিবারের সদস্যরা কবরস্থানে যান এবং প্রয়াত স্বজনদের পছন্দের খাবার ও নানা সামগ্রী দিয়ে বাড়িতে বিশেষ বেদি সাজান।
তবে ২০১৫ সালের জেমস বন্ড সিরিজের ‘স্পেক্টর’ সিনেমা এই উৎসবের উদ্যাপনে নতুন অনুষঙ্গ যোগ করে। সিনেমার শুরুতে ব্রিটিশ গোয়েন্দা জেমস বন্ডকে মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রস্থলে মৃত মানুষের সাজে সজ্জিত মানুষের ভিড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। ওই দৃশ্য থেকেই শহরে প্যারেড আয়োজনের ধারণা আসে।
শনিবারের আয়োজনে বিশাল আকৃতির কঙ্কাল, বর্ণিল শোভাযাত্রার গাড়ি, পালকযুক্ত মুকুট ও মুখোশ পরা শিল্পীরা অংশ নেন। সংগীতশিল্পী ও অ্যাক্রোব্যাটদের পরিবেশনায় শহরের প্রধান সড়কগুলো উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
পর্তুগালের ৩২ বছর বয়সী পর্যটক আনা সুয়ারেস প্যারেড দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন। এএফপিকে তিনি বলেন, মানুষের আনন্দ, পোশাক ও ফুল- সবকিছুই অসাধারণ। যারা আর বেঁচে নেই, তাদের স্মরণে মানুষ একসঙ্গে হচ্ছে, এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৭ বছর বয়সী পর্যটক ইসাবেল হ্যালসি বলেন, আয়োজনটি রঙিন, নাটকীয় এবং নানা দেশের ও ব্যক্তিত্বের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। পুরো পরিবেশটি দারুণ লেগেছে।
২০১২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মেক্সিকো সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মিগেল অ্যাঞ্জেল মানসেরা ২০১৬ সালে প্রথম প্যারেড আয়োজন করেন। তার ভাষ্য, আয়োজনটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মানুষ বারবার জানতে চাইতে থাকে, পরবর্তী প্যারেড কবে হবে।
এবারের আয়োজনে মেক্সিকো ও বিদেশ থেকে পাঁচ লাখের বেশি দর্শকের সমাগম হবে বলে আশা করেছিল নগর কর্তৃপক্ষ। একই সপ্তাহান্তে শহরে ফর্মুলা ওয়ান গ্রাঁ প্রি প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হওয়ায় পর্যটকদের উপস্থিতি আরও বেড়েছে।
বন্ড সিনেমায় ব্যবহৃত বিশাল আকৃতির কয়েকটি মূর্তি ২০১৬ সালের প্রথম প্যারেডেও স্থান পেয়েছিল। মানসেরা বলেন, আয়োজনটি এখন অনেক বড় পরিসর পেয়েছে। এটি নিয়ে তিনি গর্বিত।
এবারের উৎসব উপলক্ষে রাজধানীর প্রধান চত্বর জোকালোতে স্থাপন করা হয়েছে ১১ তলা ভবনের সমান উঁচু ‘ক্যাটরিনা’ ভাস্কর্য। ক্যাটরিনা হলো অভিজাত পোশাকে সজ্জিত নারী কঙ্কালের একটি জনপ্রিয় প্রতীকী চরিত্র।
তবে উৎসবের ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ইবেরো-আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রবার্তো মনতালভো বলেন, একসময় তুলনামূলক ঘরোয়া ও পারিবারিক পরিসরে উদ্যাপিত এই উৎসব এখন গণ-আয়োজনে পরিণত হয়েছে।
তার মতে, পর্যটকদের ভিড়ে এখন কিছু কবরস্থানে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে জায়গা ভাগাভাগি করতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে- পর্যটকদের জন্য ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান বদলাবে, নাকি দর্শনার্থীদেরই সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে?