1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
নওগাঁয় ট্রাকচাপায় ব্যাংক কর্মচারী নিহত আওয়ামী লীগ আমলে ভুয়া ঠিকানা দেখিয়ে জেলা কোটায় চাকরি নেন ১১৭৩ কনস্টেবল সুনামগঞ্জে মাইকিং করে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী জানুয়ারিতে বর্ধিত মজুরি পাবেন পোশাকশ্রমিকেরা কঙ্গো শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর কন্টিনজেন্ট প্রতিস্থাপন জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জাতীয় কর্মসূচি দফাদার এখন ‘গ্রাম পুলিশ প্রধান’, মহল্লাদার ‘গ্রাম পুলিশ’ নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকানদের কাছ থেকে জয় ছিনিয়ে নিল ডেমোক্র্যাটরা ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ গেল ব্যাংক কর্মচারীর

লোকসংগীতের গ্রাম সিংহীমারী

Reporter Name
  • Update Time : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৫২ Time View

কুড়িগ্রাম-রংপুর মহাসড়কের ছিনাই বাজার থেকে নেমে যাওয়া সড়ক ধরে এগিয়ে যেতেই সবুজে ঘেরা গ্রাম সিংহীমারী। গ্রামে ঢুকতেই শিশুকণ্ঠে ভেসে আসে বিখ্যাত লালনগীতি ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি…।’

সুরের রেশ ধরে এগিয়ে যেতেই একটি বাড়ির আঙিনায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের দেখা মিলল। অর্ধশত শিশুকে নিয়ে বসেছে লোকসংগীতের আসর। লোকবাদ্যযন্ত্রের তালে সংগীতের মূলভাবকে ধারণ করে যেন চলছে ‘সোনার মানুষ’ হওয়ার আয়োজন।

সংগীতের এই আবহে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যেরবাজার সিংহীমারী গ্রামটি যেন লোকসংগীতের গ্রাম হয়ে উঠেছে। গ্রামের সংগীতজ্ঞ নারায়ণ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে মূলত এই আয়োজন। তিনি লোকবাদ্যযন্ত্রের প্রশিক্ষক ও প্রধান গুরু। তাই তাঁর বাড়ি ‘সেবালয় গুরুগৃহ’ হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রতি শুক্র ও শনিবার শিশু-কিশোরদের বিনা মূল্যে লোকসংগীত এবং লোকবাদ্যযন্ত্র শেখানো হয়। হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতিকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে এক দশক ধরে চলছে এই আয়োজন।

গুরুগৃহে গুরুদের সামনে দোতারা, একতারা, বাঁশি কিংবা তবলা নিয়ে বসেছে শিশুরা।

একদিকে চলছে সুরের তালিম, অন্যদিকে লোকগানের অনুশীলন। শিশুরা মনোযোগ দিয়ে শিখছে, ভুল করছে, আবার গুরুর নির্দেশনায় নতুন করে সুর ধরার চেষ্টা করছে।

প্রশিক্ষক ও প্রধান গুরু নারায়ণ চন্দ্র রায় জানান, শুধু সেবালয় নয়, কুড়িগ্রামে চারটি এবং লালমনিরহাটে পাঁচটি গুরুগৃহ পরিচালনা করছে ‘মায়ের তরী’ নামের একটি সংগঠন। নয়টি গুরুগৃহের প্রতিটির চিত্র একই। বিনা মূল্যে চলছে লোকসংগীত ও লোকবাদ্যযন্ত্রের শিক্ষা। প্রতিটি গুরুগৃহের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী ও প্রশিক্ষক। তাঁদের আন্তরিকতা ও শ্রমেই এগিয়ে চলছে এই উদ্যোগ।

নারায়ণ চন্দ্র রায় মনে করেন, লোকবাদ্যযন্ত্র শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়; এগুলো একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়ের ধারক। তাঁর তত্ত্বাবধানে শিশুরা শুধু বাদ্যযন্ত্র বাজানো নয়, সুরের প্রতি ভালোবাসা এবং চর্চার শৃঙ্খলাও শিখছে।

ভিনদেশি এক নারীর এ দেশের লোকসংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধতা থেকে মায়ের তরীর যাত্রা শুরু। সংগঠনটির অন্যতম সংগঠক সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী ইউসুফ আলমগীর জানান, নরওয়ের নাগরিক কবি, লেখক, লোকগবেষক ও আলোকচিত্রী উয়েরা সেথের ১৯৯৮ সালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে যান। সেখানকার স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, বিশেষ করে নারীদের কণ্ঠে মরমি গান তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি উপলব্ধি করেন, এই গানগুলোর মধ্যে শুধু বিনোদন নয়; আছে মানুষের জীবনদর্শন, প্রেম, বিরহ, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিকতার গভীর শিক্ষা। পরবর্তী সময়ে উয়েরা সেথের লালনের ৫৩টি গান নরওয়েজীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। পরবর্তীকালে ২০১৬ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন মায়ের তরী। বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সেবালয় গুরুগৃহের শিক্ষার্থী সাথী রায় বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে এখানে গানের পাশাপাশি যন্ত্র বাজানো শিখছি। আমরা শিখে অন্যদের শেখাতে চাই।’

এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আদুরি রায় বলেন, ‘আমি গর্বিত যে প্রত্যন্ত এই গ্রামের সেবালয়ে আমার মেয়ে ও ছেলে গান ও বাদ্যযন্ত্র শেখে।’

লোকসংস্কৃতির এই লালন ও বিস্তারের কাজ চলে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে। সেবালয়ের গুরুদের সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এক দশক ধরে চলছে এই কার্যক্রম। সেবালয় গুরুগৃহের গুরু নিমাই চন্দ্র ও নির্মল চন্দ্রের মতে, লোকসংগীতের চর্চা শুধু গান শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর মধ্য দিয়ে শিশুদের একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া সম্ভব।

মায়ের তরীর বিনা মূল্যে শিক্ষার পেছনে রয়েছে গুরুদের নিরলস শ্রম ও ব্যক্তিগত ত্যাগ। এরপরও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ ও মেরামত, প্রশিক্ষকদের সম্মানী, যাতায়াত এবং গুরুগৃহগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন অর্থায়ন। অর্থের অভাবে কখনো কখনো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। সংগঠকদের মতে, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন মায়ের তরীর অগ্রযাত্রার বড় চ্যালেঞ্জ।

মায়ের তরীর অন্যতম সংগঠক ইউসুফ আলমগীর মনে করেন, সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু শিল্পী কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তাঁর মতে, ‘লোকসংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় কিংবা অঞ্চলের একক সম্পদ নয়। লোকসংস্কৃতিকে শুধু উৎসব কিংবা বিশেষ দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। তাই মায়ের তরীর গুরুগৃহগুলো কাজ করছে।’

মায়ের তরীর নির্বাহী পরিচালক সুজন কুমার বেদ বলেন, নয়টি গুরুগৃহকে একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক শিক্ষাব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। প্রয়োজন স্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র, বাদ্যযন্ত্র, প্রশিক্ষকদের সম্মানী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা। তিনি চান, মায়ের তরীর কার্যক্রম শুধু কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ুক।

সংগঠক ইউসুফ আলমগীর জানান, মায়ের তরীর স্বপ্ন কেবল শিশুদের গান শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, লোকসংস্কৃতির অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একটি ধারাবাহিক কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষণ করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

প্রবীণ লোকশিল্পী, বাউল, ভাওয়াইয়াশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী ও লোকসংস্কৃতির নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের জন্য একটি ‘আনন্দ আশ্রম’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যাঁরা অবহেলা ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে আশ্রয়, সম্মান ও সাংস্কৃতিক চর্চার একটি জায়গা। সেখানে প্রবীণ শিল্পীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো ডিজিটাল আর্কাইভ। উত্তরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকগান, শিল্পীদের কণ্ঠ, বাদ্যযন্ত্রের সুর, স্থানীয় গীতিকার ও সুরকারদের পরিচিতি, গানের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ লোকসংগীত ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রয়েছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ