পরিচ্ছন্ন শহর, নির্মল বায়ু ও সবুজ পরিবেশের জন্য একসময় দেশজুড়ে পরিচিত ছিল রাজশাহী। নগরীর উন্নয়নে সড়ক সম্প্রসারণ, সবুজায়ন ও নাগরিক সেবা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। তৈরি হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনাও। তবে নগরীর আয়তন ও জনসংখ্যা বাড়লেও পরিকল্পিত আবাসন, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও রয়েছে নানা ঘাটতি। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসন সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর পালিত হয়েছে বিশ্ব সিটি দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন নিশ্চিত করতে নগর পুনরুজ্জীবন’। এ প্রতিপাদ্যের আলোকে রাজশাহীর নগরায়ণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকলেও এর সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
২০১৪ সালের বস্তি শুমারি অনুযায়ী, রাজশাহী মহানগরীতে ১০৪টি বস্তিতে প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ পরিবারে বসবাস করতেন ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ। বর্তমানে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। এসব এলাকার বাসিন্দাদের বড় অংশই পর্যাপ্ত বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও পয়োনিষ্কাশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। গরমের সময় টিন ও প্লাস্টিকের ঘরে বসবাসও হয়ে ওঠে কষ্টকর। পাশাপাশি রয়েছে উচ্ছেদ আতঙ্ক।
বারসিকের নৃবিজ্ঞানী ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর নগর পরিকল্পনায় পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও প্রান্তিক ও বস্তিবাসীদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। গ্রিন সিটি গড়তে হলে সব শ্রেণির মানুষের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) ২০২২ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ২০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রায় ৩৬৪ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এ পরিকল্পনায় নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, প্রশস্ত সড়ক, ফুটপাত, খেলার মাঠ, জলাধার এবং আধুনিক নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার কথা রয়েছে। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালাচ্ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক)। এতে পথচারীদের চলাচলের সুযোগ তৈরি হলেও উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং সবুজ এলাকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
নগরীর নামোভদ্রা বস্তির বাসিন্দা ওবিয়া বেগম বলেন, গরমের দিনে ঘরের ভেতরে থাকা যায় না। পানি ও স্যানিটেশনের সংকট রয়েছে। উচ্ছেদের ভয় দূর করে তাদের স্থায়ী বা অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।
সুজনের রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, শুধু চওড়া সড়ক ও আধুনিক ভবন দিয়ে একটি শহরের সৌন্দর্য নিশ্চিত হয় না। নগরের দরিদ্র মানুষের আবাসন ও মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন বলেন, বস্তিবাসীরা সব সময় উচ্ছেদ আতঙ্কে থাকেন। রাজশাহীতে তাদের আবাসন উন্নয়ন ও নাগরিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রুলফাওয়ের নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, খরা ও নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষ রাজশাহীর বস্তিতে আশ্রয় নিচ্ছেন। কিন্তু তাদের জন্য সরকারি পর্যায়ে সামাজিক আবাসন বা ভূমিস্বত্বের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
আরডিএ চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাসিকের নগর পরিকল্পনাবিদ বনি আহসান বলেন, নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি সড়কদ্বীপ ও পার্কে বৃক্ষরোপণ করা হচ্ছে। জলাশয় সংরক্ষণে প্রকল্প তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া উচ্ছেদ হওয়া হকারদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
রাসিক প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, রাজশাহীকে পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সড়ক উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, খেলার মাঠ নির্মাণ ও সবুজায়নে কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। এ জন্য সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণ ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বস্তিবাসীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে। তবে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।