অবরোধের নামে যাত্রীবাহী বাসে দুর্বৃত্তদের নারকীয় পেট্রোল বোমা হামলায় গতকাল শুক্রবার রাতে রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে অগি্নদগ্ধ হয়েছেন তিন নারীসহ ২৯ সাধারণ মানুষ। তাদের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাদের সবাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। সারাদেশের মানুষ অবরোধের নামে নারকীয় হামলার নিন্দা জানাচ্ছে। কিন্তু অবরোধকারীরা নৃশংস হামলা চালিয়েই যাচ্ছে। যাত্রাবাড়ী ছাড়াও গতকাল রাজশাহীর পবা ও তানোরে বাসে পেট্রোল বোমায় আরও ১০ জন দগ্ধ হয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ১৮তম দিনে ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে ৪৬ জন দগ্ধ হয়েছেন।
গতকাল শুক্রবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে অগি্নদগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন_ বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়ায় পেট্রোল বোমায় দগ্ধ ট্রাকচালকের সহকারী আবদুর রহিম (৪৫) এবং অজ্ঞাতপরিচয় শিশুজাকির হোসেন (১৩)। এ ছাড়া গতকাল প্রথম প্রহরে সিলেটে শাহজাহান মিয়া নামে এক টেম্পোচালক নিহত হয়েছেন। এদিন ঢাকায়চারটিসহ দেশের চার জেলায় অন্তত১৩টি যানবাহনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ৬ জানুয়ারি থেকে চলা টানা অবরোধে এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ৩০ জন। ৫ জানুয়ারি নিহত হন আরও দু’জন। এর মধ্যে অবরোধকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ১৬ জন। তারা সবাই সাধারণ মানুষ। গত ১৮ দিনে অবরোধের নামে সহিংসতায় পুড়েছে ৩৪৯টি যানবাহন।প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যাত্রাবাড়ীতে আক্রান্ত গ্গ্নোরি পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪৮৮৬) গুলিস্তান থেকে নরসিংদী যাচ্ছিল। গুলিস্তান থেকে যাত্রা করে যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়ার কাঠের পুল এলাকায় পেঁৗছালে দুর্বৃত্তরা প্রথমে রাস্তায় একটি ককটেল ফাটায়। এরপর গাড়িটা সামনে গিয়ে থেমে যায়। তখন জানালা দিয়ে ৫/৬টি পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। বাসটির যাত্রী জাতীয় বাস্কেটবল দলের সদস্য ও সিটি গ্রুপের কর্মকর্তা তাকদির ইসলাম সেতু জানান, গ্রামের বাড়ি যেতে তিনি গুলিস্তান থেকে বাসে উঠেছিলেন। বাসের বাম পাশে বসেছিলেন। মাতুয়াইল সড়কে কোনাপাড়াতে পেঁৗছালে ডান পাশের জানালা দিয়ে একটি পেট্রোল ছোড়া হয় বাসের ভেতর। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসে আগুন ছড়িয়ে যায়। যাত্রীরা জানালার কাচ ভেঙে বের হন। এর আগে অধিকাংশ যাত্রী দগ্ধ হন।
তাকদির সেতু নিজেও আহত হয়েছেন। অন্য যাত্রী নাজমুল (১৯) মুরাপাড়া কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। তিনি পরিবারের সঙ্গে কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়াতে বিয়ের দাওয়াতে আসেন। ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন। তিনি জানান, হঠাৎ আগুনের একটি বস্তু জানালা দিয়ে বাসের মধ্যে এসে পড়ে। মুহূর্তে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পরে প্রাণ বাঁচাতে জানালা দিয়ে লাফ দেন। আরেক যাত্রী মোশাররফ হোসেন (৩৬) জানিয়েছেন, তিনি বাসের ডান পাশে বসেছিলেন। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন কিশোর ও যুবক পেট্রোল বোমাটি ছুড়েই পালিয়ে যায়। আগুনের কারণে তাদের চেহারা দেখতে পারেননি তিনি।
রাত ১১টার দিকে যাত্রাবাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, বাসটিতে যে স্থানে আগুন দিয়েছে তার দুই পাশে ডোবানালা ও ফাঁকা জায়গা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অতর্কিত নারকীয় হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। যাত্রাবাড়ী থানার ওসি অবণী শংকর জানিয়েছেন, যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।আগুনের ঘটনায় আহতরা হলেন_ জয়নাল আবেদিন মোল্লা (৩০), ইশতিয়াক বাবর (২৫), সালাউদ্দিন পলাশ (৩৫), তাকদির ইসলাম সেতু (২৮), সালমান (২০), নাজমুল (১৯), মো. শরিফ (৪৮), উসমান গনি (২৮), ইয়াসিন আরাফাত (৪০) ও তার স্ত্রী শাহিদা ফাতেমা (৩০), মোশাররফ হোসেন (৪০) ও তার ভাতিজা সালাহউদ্দিন (৩০), হৃদয় (২০), রাশেদ (২০), মোমেন (২৫), খোকন (৩০), নুর আলম (৩০), হারিস (৩২), ফারুক হোসেন (২০), মো. সুমন (২৫), রুবেল (২২), আবুল হোসেন (৩৫), শাহজাহান সরদার (৬০), মোজাফফর মোল্লা (৬০), শহিদুল ইসলাম (৪০) ও মো. জাবেদ (৩২)। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আফরোজা (৩০)।বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক ডা. সাজ্জাদ খন্দকার জানিয়েছেন, ২৯ জনের মধ্যে ৯ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের কারও কারও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। তাদের কাউকে কাউকে আইসিইউতে নিতে হতে পারে। সবাইকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতস্থান ব্যান্ডেজ করার মতো প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। রাতেই বাকি সেবা গুরুতরদের উচ্চতর চিকিৎসা দেওয়া হবে।