1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন

বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৬ Time View

আরো একটা মাইলফলক অর্জন করতে যাচ্ছে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়েক দফা পিছিয়ে অবশেষে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ইউনিট-এ’কে এজন্য প্রস্তুত করা হয়েছে । বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, আগামী ৭ এপ্রিল চুল্লিতে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম রড) লোড করা হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এক মাসের মতো সময় লাগতে পারে ।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে পালটাপালটি আঘাত হানা হচ্ছে জ্বালানি স্থাপনায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়মিত কমছে, বাড়ছে দাম । বাংলাদেশে ৭০ শতাংশের বেশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উৎস কাতার উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে দীর্ঘ সময় । ফলে গ্যাস-সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এই পরিস্থিতিতে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা মনে করছেন ।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান E সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নাম রিয়াক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্র । এই চুল্লিপাত্রের ভেতরেই জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত ইউরেনিয়াম সংযোজন বা লোড করা হয়—যাকে বলা হয় ফুয়েল লোডিং। খনি থেকে সংগ্রহ করা ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাত করে ছোট ছোট দানাদার আকৃতিতে তৈরি করা হয়, যেগুলোকে বলা হয় ‘পেলেট’। এরপর কয়েক শ পেলেট একটি ধাতব নলের ভেতরে ঢুকিয়ে তৈরি করা হয় ফুয়েল রড। এ ধরনের অনেকগুলো ফুয়েল রড একত্রে সংযোজন করে তৈরি করা হয় একটি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে । এসব জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আগেই রাশিয়া থেকে এনে প্রকল্প এলাকায় সংরক্ষণ করা হয়েছে । প্রকল্প কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এক বছরের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকাল জুড়েই জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। সংক্ষেপে, ফুয়েল লোডিং হলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রিয়াক্টরে জ্বালানি স্থাপন করা হয়।

এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানালেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পর ফিশন বিক্রিয়া শুরু, তাপ উৎপাদন এবং সেই তাপ সঞ্চালনের মাধ্যমে টারবাইন ঘোরানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি প্রস্তুত রয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ কঠোর পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করা হবে। একটি ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার পরই পরবর্তী ধাপ শুরু করা হবে, যাতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা যায় ।

পারমাণবিক চুল্লিতে ইউরেনিয়াম-২৩৫ ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। তবে সবকিছু অনুকূলে থাকলে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনায় এটি ২১ দিনের মধ্যেও শেষ করা সম্ভব ।

প্রাথমিকভাবে খুব কম মাত্রায়—প্রায় ১ শতাংশ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হয়, যা পর্যায়ক্রমে ২ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় । এই ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে । এ সময়ের প্রতিটি ধাপে কঠোর পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চালানো হয়, যাতে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করা যায়।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি প্রস্তুত। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ক্ষেত্রে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত মানে বজায় রাখা নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষ কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে । যদিও পিজিসিবির কাজ নিয়ে রূপপুর প্রকল্পে দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশি সংশ্লিষ্টরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
রূপপুর থেকে প্রাথমিকভাবে অল্প পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। এ সময় জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে সিনক্রোনাইজ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে ।

ফুয়েল লোডিংয়ের পর পূর্ণ সক্ষমতায়— প্রায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে ।

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে। এর ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, ফুয়েল লোডিং, চালু করা এবং জ্বালানি সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সংস্থা মনিটর করে। প্রতিটি ধাপে প্ৰকল্প পর্যবেক্ষণ করে IAEA করণীয় ও নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিবেদন প্রদান করে। নির্মাণ থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রায় ১৯টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়, এবং প্রতিটি ধাপের জন্য IAEA বিভিন্ন মিশন পরিচালনা করে। তাদের প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো নির্ভয়ে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে পারে ।

এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব পরমাণু শক্তি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা- পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA ) – গঠন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত IAEA-এর প্রতিবেদনগুলো ইতিবাচক এবং বাংলাদেশের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করেছে।
সাধারণভাবে বলতে গেলে,একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মূলত একটি অত্যাধুনিক মেশিন। এটি তৈরি করতে হয় পারমাণবিক প্রকৌশল, বিশেষায়িত উন্নত বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি এবং সিভিল প্রকৌশলের সমন্বয়ে। প্রতিটি ধাপ ধাপে পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়, একই সঙ্গে মেনে চলতে হয় বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রটোকল ।
যদি কোনো বাধা না আসে, তাহলে একেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সাধারণত ৮ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। চালুর সময় যেসব যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়—তাদের সঠিকভাবে সিনক্রোনাইজড হয়েছে কিনা তা কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়। রিয়াক্টর থেকে শুরু করে টারবাইন এবং গ্রিড পর্যন্ত সবকিছু সঠিকভাবে নির্মাণ হয়েছে কিনা তাও বড় বিষয়। এই সব উপাদান সমন্বিতভাবে ও নির্ভুলভাবে কাজ করলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সফল বলা যায় ।

রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রটি পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (NPCCBL) | এজন্য নিয়ন্ত্রিত ও পেশাদার কর্মীবাহিনী তৈরি করা হয়েছে, যাদের অনেকেই প্রকল্পের নির্মাণ প্রক্রিয়ার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন । তাদের প্রশিক্ষণের বড় অংশ ইতিমধ্যেই রাশিয়াতে সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া এই জনবল কাঠামো গঠন ও প্রশিক্ষণ সরবরাহ করেছে। শুরুতে রাশিয়ার অপারেটরদের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ চুল্লি চালু করা হবে, যেখানে সহযোগী হিসেবে থাকবেন বাংলাদেশিরা।

আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ান ফেডারেশনের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে নির্মাণ করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে সমীক্ষা চুক্তি এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন হয় । চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া প্রকল্পটিতে অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে । প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে। অন্যদিকে, দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি । প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এটি আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবমিলিয়ে, পুরো প্রকল্পের কাজ ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে । সেই অনুযায়ী, আগামী বছরের শুরুর দিকে রূ পপুর থেকে প্রথম ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে এবং ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ আরো ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে, ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে ।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৫ প্রিয়দেশ