জেলা প্রশাসনের তদারকিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বসুন্ধরার সিলিন্ডারের জন্য, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৬৩ টাকা বেশি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও তা ২ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির তথ্য পেয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন।
জেলা প্রশাসনের তদারকিতে দেখা গেছে, ঢাকার পাঁচ উপজেলায় তালিকাভুক্ত ৩৯টি কোম্পানি ও এলাকার দরের মধ্যে ২৯টিতেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ অক্টোবর বিভিন্ন কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৯০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বসুন্ধরার সিলিন্ডারের জন্য, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৬৩ টাকা বেশি।
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবকে পাঠানো এক চিঠিতে এলপিজির বাজারদরের এই চিত্র তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
রোববার পাঠানো ওই চিঠিতে সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলায় কোম্পানিভেদে সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্য তুলে ধরা হয়েছে। চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়েছে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকেও।
দাম নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কার্যক্রমের বিবরণ দিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বাজার তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দোকানিদের মূল্যতালিকা প্রদর্শন ও নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও গত কিছুদিন ধরে এলপিজির বাজারে অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড দিয়ে আসছে। তবে এসব উদ্যোগ নিয়ে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করা যায়নি।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনটির একটি অনুলিপি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম দেখেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, “ভোক্তা পর্যায়ে কত বিক্রি হচ্ছে সেই তথ্য আমরা বের করেছি।”
‘ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে’ এই তথ্য পাওয়ার কথা তুলে ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ভোক্তা পর্যায়ে কত টাকায় কী পরিমাণ বিক্রি হচ্ছে সেই হিসেবে আমরা রিপোর্ট করি।”
ঢাকা জেলা প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী, পাঁচ উপজেলার মধ্যে সাভার ও ধামরাইয়ে কোম্পানিভেদে দামের ব্যবধান সবচেয়ে বেশি। তবে সব উপজেলায় একই কোম্পানির সিলিন্ডারের দাম এক নয়।
সাভার: এখানে ১৩টি কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৯০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বসুন্ধরার সিলিন্ডারের জন্য। ডেল্টার দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা, আই গ্যাস ও টিএমএসএসের ২ হাজার ২৫০ টাকা এবং তীরের সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা।
ওরিয়েন্ট ও ইউরোর সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। পেট্রোম্যাক্স ও সেনার দাম ১ হাজার ৯০০ টাকা, ওমেরার ১ হাজার ৮৫০ টাকা, টোটালের ১ হাজার ৮২০ টাকা এবং যমুনার ১ হাজার ৮০০ টাকা। সবচেয়ে কম ১ হাজার ৭৯০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বিএমের সিলিন্ডারের জন্য।
ধামরাই: এখানে নয়টি কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডারের মধ্যে বেক্সিমকোর দাম সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ২০০ টাকা।
ইউনি ও বিএমের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়, টোটালের ১ হাজার ৯৫০ টাকায়।
বসুন্ধরা, যমুনা ও ফ্রেশের সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯০০ টাকা। ওমেরার ১ হাজার ৮৫০ টাকা এবং সানের ১ হাজার ৮০০ টাকা।
কেরানীগঞ্জ: তালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানির সব কটির সিলিন্ডারই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
বসুন্ধরার ১২ কেজির সিলিন্ডারর দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা, ইউনি ও তীরের ২ হাজার ২০০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্সের ১ হাজার ৯০০ টাকা।
নবাবগঞ্জ: এখানে ইউনির সিলিন্ডারের দাম সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৬০ টাকা। ওমেরা, টোটাল, বিএন ও টিএমএসএসের দাম ১ হাজার ৯০০ টাকা করে। ডেল্টা ও ফ্রেশের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ টাকায়। যমুনার দাম ১ হাজার ৮২০ টাকা।
দোহার: তালিকাভুক্ত পাঁচটি কোম্পানির সিলিন্ডারই ১ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে ৩৭ টাকা কম। কোম্পানিগুলো হল যমুনা, বিএম এনার্জি, পেট্রোম্যাক্স, ইউনাইটেড আই গ্যাস ও টিএমএসএস।
নির্ধারিত দামের বেশি বিক্রির ঘটনায় ঢাকা জেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড দিয়েছে কি না, জানতে চাইলে ফরিদা খানম বলেন, “আমাদের কেরানীগঞ্জে হয়েছে। কেরানীগঞ্জে কিছু অভিযান হয়েছে এবং অর্থদণ্ডও হয়েছে।”
দাম কমানোর উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, “এটা তো ধরেন আলাপ-আলোচনার ভেতরে আছে। ডিলারদেরও অনেক যুক্তি আছে তারা কেন দামটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভোক্তা পর্যায়ে কেন দাম বাড়াচ্ছে। এজন্য আমরা মোটিভেশনাল একটা ওয়ার্কিংয়ের ভেতরে আছি আমরা।
“আমরা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে- ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়লে এটা তো একটা একটা ‘অসহনীয়’ একটা অবস্থায় চলে যায়। তো আমরা মোটামুটি তাদেরকে সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের প্রত্যেকটা উপজেলাতেই এই সংক্রান্ত কার্যক্রম চলছে।”
এদিকে এলপিজি বিপণনের কোম্পানিগুলো দাবি করছে, বর্তমান নির্ধারিত দামে ব্যবসা চালানো ‘কঠিন’।
গ্যাস বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যুক্তি তুলে ধরে তারা পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন এবং বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
কোম্পানিগুলো গ্যাস মজুদ ও বোতলজাত করার খরচের পাশাপাশি পরিবহন, কারখানা পরিচালনা, নিরাপত্তা এবং ব্যাংকঋণের সুদের ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলেছে।
কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবেও খরচের হিসাব এক নয়। প্রতি কেজি এলপিজি মজুদ ও বোতলজাত করার খরচ হিসেবে ওমেরা এলপিজি ১২ টাকা ২৫ পয়সা, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি ২৫ টাকা, ডেল্টা এলপিজি ৩০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজি সাড়ে ১৯ টাকা দাবি করছে।