দেশে কার্যরত বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩৮ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩২১ কোটি টাকায় নেমেছে। বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম কমে যাওয়া এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফায় এ পতন ঘটেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে তা ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা কমেছে।
অন্যদিকে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট মুনাফা কমেছে ৪৯৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।
তবে মুনাফা কমলেও দেশের ৬৭টি শাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি শক্তিশালী, পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে এবং সম্পদের মানও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানত ও ঋণের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ তুলনামূলক কম হলেও বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ব্যাংকিং সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব ব্যাংক।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ববর্তী মুনাফা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং আগের ছয় মাসের তুলনায় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ কম। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে মুনাফার হারও কমেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান টিবিএসকে বলেন, ব্যাংক খাত বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। আয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত থাকায় ব্যাংকগুলোর মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, "খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি হলে লোকসান অনিবার্য হয়ে পড়ে।"
মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানির পরিমাণ কমেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় মেটাতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে অব্যাহত সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আয় ও মুনাফার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
আমানত শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও ঋণ প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি
দেশে কার্যরত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ৮৭ হাজার ৩৭৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা দেশের ব্যাংক খাতের মোট আমানতের প্রায় ৪ শতাংশ।
দেশীয় ব্যাংকগুলো যেখানে সাধারণ গ্রাহকদের বিস্তৃত পরিসরে সেবা দিয়ে থাকে, সেখানে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম মূলত করপোরেট গ্রাহককেন্দ্রিক। এসব ব্যাংকের আমানতের বড় অংশই চলতি হিসাব, সঞ্চয়ী হিসাব ও রেসিডেন্ট ফরেন-কারেন্সি অ্যাকাউন্ট বা নিবাসী বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা রয়েছে। ফলে তুলনামূলক কম খরচে তহবিল সংগ্রহ করতে পারছে ব্যাংকগুলো।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৪৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
দেশের রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের ১৮.৬ শতাংশ বিদেশি ব্যাংকের মাধ্যমে
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৩৯৫ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ৪৬২ কোটি ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানি ব্যয়ের ১৩ শতাংশের বেশি।
আমদানি মূল্য পরিশোধের তুলনায় রপ্তানি আয় দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ বেশি হলেও বৈদেশিক মুদ্রার নিট অবদান নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট অর্থপ্রবাহের প্রকৃত পরিমাণ এবং অর্থ আসা-যাওয়ার সময়ের ওপর।
খেলাপি ঋণ বাড়লেও মূলধন পরিস্থিতি শক্তিশালী
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে। এক বছর আগে এ হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ।
তবে খেলাপি ঋণ বাড়লেও দেশীয় ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কম রয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত বড় করপোরেট ঋণগ্রহীতা, বহুজাতিক কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ভালো ঋণমানসম্পন্ন রপ্তানিমুখী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
২০২৬ সালের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ২১ শতাংশে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সীমার তুলনায় অনেক বেশি। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর টিয়ার-১ মূলধনের অনুপাত ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, সম্ভাব্য আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত মূলধন সুরক্ষা রয়েছে।
তারল্য পরিস্থিতিও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেকই তরল সম্পদ। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর গ্রাহক আমানতের পরিমাণ মোট ঋণের তুলনায় ২৮ শতাংশের বেশি।
পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ এবং তুলনামূলক সতর্ক ঋণ বিতরণ নীতির কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ৬২১ কোটি ৩০ লাখ টাকায়।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.