রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসে একের পর এক সংঘাত, হামলা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলেও সেগুলো প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ক্যাম্পাসে ঘটেছে বেশকিছু সহিংসতার ঘটনা। এতে দেশব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
প্রক্টোরিয়াল বডি বা শিক্ষকদের সামনে হওয়া এসব আলোচিত সহিংস ঘটনা ঠেকাতে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে রাবি প্রশাসন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। হামলা-সহিংসতার ভিডিও ফুটেজ নিতে গেলে বেশ কয়েকবার হেনস্তা ও মারধরের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকরাও।
সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে রাবি ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলায় ৪ সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। কিন্তু তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা ব্যর্থ আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। আমরা পুলিশকে ফোন দিয়েছি কিন্তু পুলিশ ভয়ে পালিয়ে গেছে।
শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রতিবাদের মুখে পরদিন রাতে ওই হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের মধ্যে ৪ জনকে সাময়িক ছাত্রত্ব বাতিল, ৪ জনকে অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ ও ৩ জনকে সর্তক করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মামলা দায়ের করা হলেও অভিযুক্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি প্রশাসন।
এ ঘটনায় ৫ অক্টোবর রাতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল অভিযুক্ত ৩ জনকে সাংগঠনিক পদ থেকে বহিষ্কার ও ৬ জনকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়।
বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে অন্তত ৫টি এমন সহিংস ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও অন্তত ১৫টি হামলা, মারধর ও কথা কাটাকাটির প্রেক্ষিতে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা বা শিক্ষকরা উপস্থিত বা মধ্যস্থতার চেষ্টা করা সত্ত্বেও শিক্ষার্থী বা সাংবাদিকরা হামলা থেকে বাঁচতে পারেননি।
চলতি বছরের ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের কাছে র্যাগিংয়ের ভিডিও ধারণ করায় মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের হাতে সাংবাদিক মারুফ হোসেন মিশন, জুবায়ের জিসান ও আবু বকর অনিক এবং রাকসু নেতা এস এম সালমান সাব্বির ও ইমরান লস্কর হেনস্তার শিকার হন।
পরে বিষয়টি মিটমাট করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান ও মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. বোরাক আলী ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু নিরাপত্তা দিয়ে সাংবাদিকদের প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পথেই তাদের ওপর হামলা চালানো হয়।
গত ২৭ জুলাই রাকসু সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক সালমান সাব্বির প্রক্টর দপ্তরে ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করেন।
পরে রাকসু কার্যালয়ে হামলাকে কেন্দ্র করে ৩ শিক্ষার্থীকে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে বেলচা হাতে মারধরের অভিযোগ ওঠে রাকসু জিএস আম্মার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় শিবিরের কিছু নেতাদের সংশ্লিষ্টতারও অভিযোগ পাওয়া যায়।
এছাড়াও গত বছরের ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে প্রক্টোরিয়াল বডির উপস্থিতিতে ‘শাহবাগবিরোধী ঐক্যের’ ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী বামপন্থী দলের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় এবং হামলা চালায়।
ওই ঘটনা সম্পর্কে প্রক্টর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ঘটনাস্থলে গিয়ে উভয় পক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন। সেখানে ছাত্র উপদেষ্টাও কাজ করেছেন। এ ঘটনায় উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ করেছে
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পোষ্য কোটা আন্দোলনের জের হিসাবে রাবির জুবেরি ভবনে তৎকালীন উপ-উপাচার্য ড. মাঈন উদ্দিনসহ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে শারীরিক হেনস্তা, মারধর ও লাঞ্ছিত করেন তৎকালীন সমন্বয়ক ও বর্তমান রাকসু জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। ঘটনা তদন্তে পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর রাবি প্রশাসন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম ফখরুল ইসলামকে প্রধান করে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেন। দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এ ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে তৎকালীন প্রশাসনকে নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে এবং বর্তমান প্রশাসনেরও তেমন কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি।
এছাড়াও ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে আইন ও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে শিক্ষক মাহফুজুর রহমান ও এক সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
এসব সহিংস পরিস্থিতির জন্য জবাবদিহিতার অভাব, জড়িতদের শাস্তি না দেওয়া এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবকে দায়ী করেছেন রাবি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষার্থী বলেন, ক্যাম্পাসে যতগুলো সংঘাত হয়েছে তার মধ্যে বেশিরভাগই রাজনৈতিক। বিগত বছরের সংঘাতগুলোর ব্যবস্থা নিতে তেমন কোনো অগ্রগতি প্রশাসনের দেখিনি। জড়িতরা শাস্তি না পাওয়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে আবারও সংঘাতে জড়াচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ হলে পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হতে পারে। জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, দলান্ধ হওয়া উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা রাজনৈতিক আনুগত্য ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ‘ঢেউ’ এখনো তরুণদের প্রভাবিত করছে। প্রয়োজনের সময় পুলিশ পাওয়া গেলেও তারা ততটা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
তিনি বলেন, পুলিশ শুধু ঘটনাস্থলে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। এসব চ্যালেঞ্জের কারণেই বারবার এসব ঘটনা ঘটছে।